শাতিমে রাসুল অর্থ কী – ইসলামে শাতিমে রাসুলের বিধান

শাতিমে রাসুল – রাসুল – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – ‘কে গালমন্দকারী বা তাঁর চরিত্র নিয়ে রটনাকারীর বিধান কী ?

এই উত্তরটির বিস্তারিত আলোচনা থাকছে আজকের পরিবেশনায় – ব্লগটিতে থাকছে . . . .

শাতিম রাসুল অর্থ কী

শাতিমে রাসুল অর্থ কী – আরবি শব্দ ‘শাতমুন’ অর্থ গালি দেওয়া। যার কর্তা বাচক শব্দ শাতিম বা গালিদাতা। ফলে শাতিম শব্দটি রাসুল শব্দের দিকে সম্বন্ধিত হওয়ায় অর্থ হবে – রাসুলকে গালিদাতা।

তাই স্বাভিকভাবে শাতিমে রাসুল দ্বারা যে ব্যক্তি রাসুল্লাল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে গালি দেয় বা তাকে নিয়ে কটুক্তি বা অপমান করে সেই শাতিমে রাসুল বিবেচত হয়।

ইসলামে শাতিমে রাসুল ও তার বিধান

কোনো মুসলিম রাসুল – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস সালাম – কে গালাগাল বা ব্যাঙ্গ করলে সকল ইসলামি স্কলারের ঐক্যমতে সে মুরতাদ হয়ে যাবে ৷

• পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন বলেন –

‘তুমি তাদের প্রশ্ন করলে তারা অবশ্যই বলবে – আমরা তো হাসি-তামাশা ও বিনোদন করছিলাম। তুমি তাদের বলো – তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে বিনোদন করছিলে ?’ ( সুরা তাওবা – ৬৫ )

  • এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া – রাহিমাহুল্লাহ – বলেন –

‘এটা এই ব্যপারে বিবৃতি দিচ্ছে যে আল্লাহ তায়ালা, তার আয়াতসমূহ এবং রাসূলগনকে নিয়ে ঠাট্টা করা কুফরী ৷ এগুলো যদি কুফরী হয় তবে গালাগাল তো অবশ্যই কুফরী হবে ৷’ ( আসসারিমুল মাসলুল )

  • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল – রাহিমাহুল্লাহ –

‘যে রাসুলকে গালি দিলো বা তাঁর সম্মানহানি করলো। তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। চাই যে মুসলিম হোক বা কাফির।’

  • ইমাম মালিক – রাহিমাহুল্লাহ – বলেন –

‘যে রাসুলকে গালি দিলো তাকে হত্যা করা হবে।’

  • ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর ছাত্ররা বলেন –

‘যে রাসুলের সম্মানহানি করলো বা তাঁর (বিধান থেকে) মুক্ত ঘোষণা করলো বা তাকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করলো সে মুরতার।’ (আসসারিমুল মাসলুল ৷

শাতিমে রাসুলের শাস্তি

শাতিমে রাসুল তিন প্রকার হতে পারে। এক – শাতিমে রাসুল মুসলমান। দুই – শাতিমে রাসুল যিম্মি। তিন – শাতিমে রাসুল দারুল কুফরের কাফির।

তাই তিন প্রকারের শাতিমে রাসুলের শাস্তি নিয়ে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করছি।

মুসলিম শাতিমে রাসুলের শাস্তি

ইসলামি স্কলারদের ঐক্যমতে শাতিমে রাসুল মুসলিম হলে তাকে হত্যা করতে হবে ৷

মুসলিম শাতিমে রাসুলকে হত্যার দালায়িল

  • রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – বলেন

যে ব্যক্তি স্বীকার করে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই আর আমি আল্লাহর রাসুল, তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। তবে তিন কারণের কোনো একটি পাওয়া গেলে হত্যা বৈধ।

এক – সে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে। দুই – বিবাহিত অবস্থায় যেনা করলে। তিন – ইসলাম ত্যাগ করে উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে। ( বুখারী – ৬৮৭৮ )

  • রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – বলেন –

‘কোনো ব্যক্তি তার ধর্ম বদল করে নিলে তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করো ৷’ ( সহিহ বুখারি – ৬৯২২ )

  • উরওয়া বিন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেন –

‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে গালাগাল করতো ৷ রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – একদিন বললেন আমার শত্রুর জন্য আমার পক্ষ থেকে কে যথেষ্ট হবে ?

খালেদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন আমি আছি ৷ তখন রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – তাকে প্রেরণ করেন। অতপর তিনি তাকে হত্যা করে ফেলেন ৷’ ( আল মুহাল্লা বিল আসার )

যিম্মি শাতিমে রাসুলের শাস্তি

শাতিমে রাসুল যিম্মি (ইসলামি রাষ্ট্রে টেক্স আদায় করে বসবাসকারী কাফির) হলে তার শাস্তির ব্যাপারে ইমামগণ মতানৈক্য করেছেন।

প্রথম অভিমত

ইমাম আহমদ, ইমাম মালিক ও ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুমুল্লাহ‘র মতে মুসলমানের মতো যিম্মি কাফিরকেও হদ হিসাবে হত্যা করা হবে ৷

সে নবীকে অবমাননা করার দ্বারা নিরাপত্তাচুক্তি ভঙ্গ করে ফেলেছে। ইসলামি রাষ্ট্রে তার নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার নেই ৷

তাদের দালায়িল

আল্লাহ তায়ালা বলেন –

‘তারা যদি নিরাপত্তাচুক্তি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করে তবে কুফরের প্রতিনিধিত্বকারীদের হত্যা করে দাও ৷'(সুরা তাওবা – ১২)

সায়্যিদিনা আলি – রাদিয়াল্লাহু আনহু – থেকে বর্ণিত

এক ইয়াহুদি মহিলা রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – কে গালমন্দ করত, বাজে কথা বলত। তখন এক ব্যক্তি তার গলা চেপে ধরলে সে মারা যায়।

কিন্তু রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – তার রক্তকে মূল্যহীন সাব্যস্ত করেন। (সুনানে আবু দাউদ – ৪৩৬২)

সিরাতে ইবনে হিশামে উল্লেখ করা হয়

মদিনায় আবু ইফক নামে এক ব্যক্তি বাস করতো। সে রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – কে নিয়ে কুৎসামূলক কবিতা রচনা করা ছিলো তার অভ্যাস।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে সালিম আমির নামীয় একজন সাহাবিকে পাঠালেন। অতপর সালিম আমির তাকে হত্যা করেন। ( সিরাতে ইবনে হিশাম-৪/২৮৫)

দ্বিতীয় অভিমত

ইমাম আবু হানিফা, সুফিয়ান ছাউরিসহ কিছু আলিমের মতে তার উপর শরিয়া নির্ধারিত হত্যা আসবে না ৷ শাসক বা বিচারক যে শাস্তি নির্ধারিত করবে তাকে সেই শাস্তি প্রদান করতে হবে ৷

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা – থেকে বর্ণিত –

একদা কয়েকজন ইয়াহুদি রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – ‘র নিকট এস বললো – তোমার উপর মরণ আসুক । আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন- এ কথা শুনে আমি তাদেরকে অভিশাপ দিলাম ৷

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – জিজ্ঞেস করলেন- তোমার কী হলো? আমি বললাম- তারা কী বলেছে, আপনি কি তা শুনেননি?

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – বললেন, আমি তো বলেছি ‘তোমাদের উপরও’ তা কি তুমি শোননি? ( সহিহ বুখারি- ২৯৩৫ )

ইমাম তাহাবী রাহি. বলেন-

‘ইয়াহুদি যে রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – কে ‘তোমার মৃত্যু আসুক’বলে মারাত্মক কথা বলেছে তা কোনো মুসলিম বললে সে মুরতাদ হয়ে যেত এবং তাকে হত্যা করা হতো ৷

কিন্তু রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – ঐ ইয়াহুদিকে হত্যা করেননি ৷ ( উমদাতুল কারী )

আনাস ইবনু মালিক – রাদিয়াল্লাহু আনহু – থেকে বর্ণিত

এক ইয়াহুদি মহিলা রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-‘কে বিষ মিশানো বকরীর মাংস খাওয়ানোর ঐ মহিলাকে ধরে নিয়ে আসা হল ৷

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলা হল – আমরা কি তাকে হত্যা করবো না? তিনি বললেন, না। ( সহিহ বুখারি – ২৬১৭ )

কাফির শাতিমে রাসুল ও তার শাস্তি

শাতিম দারুল কুফরে বসবাসকারী কাফির হলে তার উপর ইসলামি আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রয়োগ করা যাবেনা ৷ কারণ তাদের উপর আমাদের কর্তৃত্ব নেই ৷

তারা তাদের দেশে বসবাস করে। তাদের রয়েছে নিজস্ব সরকার। নিজস্ব আইন। তাই অন্য সরকার বা মুসলিম শাসক তাদের উপর হুকুম প্রয়োগ করতে পারবে না।

শাতিমে রাসুল – তাওবা কবুল হবে কি না

ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ থেকে একটি উক্তি মতে শাতিমে রাসুলের তাওবা গ্রহনযোগ্য হবে না।

ইমাম আবু হানিফা, শাফিয়ি, সুফিয়ান ছাওরি, ইমাম আওযায়িসহ অধিকাংশ আলিমদের মতে তার তাওবা কবুল হবে।

আল ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবায়া গ্রন্থে বলা হয় –

যে নবি – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে স্পষ্টভাবে গালি দেয় বা তাঁর সুউচ্চ মর্যাদায় আঘাত করে বা যে কোনো নবি, জিবরিল বা মিকাইলকে গালি দেয় তার শাস্তির ব্যাপারে দুটি অভিমত রয়েছে।

প্রথমটি হলো – তাকে ‘হদ’ হিসাবে হত্যা করা হবে। তার তাওবা কবুল হবে না।

দ্বিতীয় অভিমত হলো – তার হুকুম মুরতাদের মতো – যে তার স্রষ্টাকে গালি দেয়। যদি সে তাওবা না করে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। এই অভিমতের উপরই আমল চলে আসছে।

শাস্তি প্রয়োগ করার দায়িত্ব কার

এ ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়াসহ যারা শাতিমে রাসুলকে হারবী হিসাবে গণ্য করে থাকেন তারা মনে করেন শাতিমকে যেকেউ হত্যা করতে পারবে ৷ তাকে হত্যা করাটা কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় ৷

যেমন ইবনু তাইমিয়া বলেন –

এটা যদিও হদ্দ কিন্তু সাথে সাথে একজন হরবী কাফিরকে হত্যাও বটে ৷ সুতরাং শাতিমে রাসুলকে হত্যা করাটা যখন হরবী কাফিরকে হত্যা করার মতো হয়ে গেল তখন যে কেউ তাকে হত্যা করতে পারে ৷

এই অর্থের উপরই প্রয়োগ হবে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-‘র কথা –
‘এক পাদ্রী সম্পর্কে তাকে সংবাদ দেওয়া হলো যে সে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে গালি দিয়েছে ৷

তখন তিনি বলেছিলেন- ‘আমি শুনলে ঐ শাতিমকে সেখানেই হত্যা করে ফেলতাম’ ৷ ( আস-সারিমুল মাসলুল )

তবে হানাফি মাযহাবসহ সংখ্যাগরিষ্ট আলিমদের মতামত হল- ইসলামি রাষ্ট্রে যে কোন শাস্তি কার্যকর করবে শাসক বা শাসকের প্রতিনিধিরা ৷

শাতিমে রাসুল মুরতাদের অন্তর্ভুক্ত তাই তার শাস্তিও সরকার কার্যকর করবে৷

আল্লাহ তায়ালা সর্বোপরি সর্বজ্ঞ

উত্তর লিখনে
শাহ মুহাম্মাদ সুহাইল

Leave a Comment