হস্তমৈথুন কি হারাম? ইসলামে হস্তমৈথুনের বিধান

হস্তমৈথুন কি হারাম? এ প্রশ্নটি বেশ আলোচিত। কিন্তু তার যথাযথ উত্তর আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।

এটি হারাম হলে কেন হারাম? আর যদি হারাম না হয় তাহলে কেন হারাম নয়? সেটা বিশদভাবে আলোচনা হয়নি।

তাই প্রশ্নটির বিস্তারিত উত্তর আলোচনা করতে যাচ্ছি আজকের ব্লগে।

ব্লগটিতে থাকছে

  • হস্তমৈথুন কি
  • হস্তমৈথুন কি হারাম?
  • ইমামগণের অভিমত ও পর্যালোচনা
  • হস্তমৈথুন ও শেষ কথা

হস্তমৈথুন কি

হস্তমৈথুনকে আরবিতে বলা হয় ( الاستمناء باليد)। এটি এক প্রকার যৌনক্রিয়া। যেখানে একজন ব্যক্তি সঙ্গী বা সঙ্গিনী ছাড়া যৌন আনন্দ লাভ করতে চেষ্টা করে।

এ যৌনকর্মে হাত দ্বারা পুরুষ তার লিঙ্গ ও নারী তার যৌনি ঘর্ষণ করে বলে তাকে হস্তমৈথুন বলা হয়ে থাকে।

তবে এটি বর্তমানে হাত ব্যবহার ছাড়াও অন্যান্য উপায় যেমন সেক্স ডল, ভাইব্রেটর ইত্যাদি ব্যবহার করে করা সম্ভব। একে আত্মমৈথুন ও স্বকামও বলা হয়।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই হস্তমৈথুনের প্রচলন লক্ষণীয়। বহু প্রাচীন রচনা ও কাব্যে তার বিবরণ পাওয়া যায়।

হস্তমৈথুন কি হারাম?

হস্তমৈথুন নিয়ে আমাদের পূর্বসূরি ইমামগণ বেশ বিস্তর আলোচনা করে গেছেন। তাদের মধ্যথেকে বিরাট এক জামাত এটিকে হারাম ঘোষণা করেছেন।

অন্যদিকে অনেকে হস্তমৈথুন হালাল বলেও অভিমত পেশ করেছেন। আবার কেউ কেউ এটা বৈধ হওয়াকে শর্তের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন।

তাছাড়া হস্তমৈথুন কয়েক প্রকারে হতে পারে। যেমন যিনায় লিপ্ত হওয়ার আশংকা থেকে হস্তমৈথুন।

স্ত্রীর হাতের সাহায্য হস্তমৈথুন। অকারণে কেবল যৌনস্বাদ ভোগের জন্য হস্তমৈথুন।

এই সবকটি প্রকারকে কেন্দ্র করে আবার হুকুমও ভিন্নভিন্ন হতে পারে। যা আলাদা আলাদাভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

তাই আমরা সম্মানিত ইমামগণ – ইসলামি স্কলারদের অভিমত ও দলিলগুলো পেশ করবো।

অতপর শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মতটি পাঠকদের সামনে চিহ্নিত করে দিবো।

হস্তমৈথুন হারাম – অভিমত ও দালায়িল

হানাফি, শাফিয়ি, মালিকি ও হাম্বলি অর্থাৎ চার মাযহাব ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে ইলমের মতে হস্তমৈথুন হারাম।

তাদের অভিমত প্রমাণকারী দালায়িল

প্রথম: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন –

‘যারা আপন স্ত্রী ও বাঁদি ছাড়া নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে রাখে তারা অভিসম্পাতপ্রাপ্ত হবে না।

তবে যে এদের (স্ত্রী ও বাঁদী) ব্যতীত কাম বাসনা পূর্ণ করতে চায় তারা সীমালঙ্ঘনকারী। (সুরা মুমিনুন : ৪-৬)

ইমাম শাফি – রাহিমাহুল্লাহ – তার কিতাবুল উম্ম গ্রন্থে বলেন –

আয়াতে নিজ স্ত্রী ও বাঁদী ব্যতীত লজ্জাস্থান হেফাজতের কথা দ্বারা প্রমাণ হয় স্ত্রী ও বাঁদী ব্যতীত বাকী সকল উপায় হারাম।

কাজেই স্ত্রী ও বাঁদী ব্যতীত যৌনক্রীয়া বৈধ নয়। তাই হস্তমৈথুন হারাম।

কিছু আহলে ইলম হস্তমৈথুন হারাম হওয়ার উপর নিচের আয়াতটি পেশ করেন –

‘যারা অবিবাহিত তারা নিজের চরিত্র পবিত্র রাখবে যতোক্ষণ না আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে তাদের স্বচ্ছল করবেন। (সুরা নুর – ৩৩)

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিবাহের সামর্থ্য দান করার আগ পর্যন্ত নিজ চরিত্র সংরক্ষণ করে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

অথচ হস্তমৈথুনের দ্বারা যৌন কামনা নিবারণের বিষয়ে জ্ঞাত থাকার পরও তিনি সে দিকে নির্দেশা দেননি। তাই হস্তমৈথুন করা যাবে না।

দ্বিতীয়: রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু – আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন,

‘হে যুবক সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যথেকে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখো তারা বিবাহ করে নাও। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও গোপনাঙ্গ সংযত রাখার অধীক উপযুক্ত।

আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা তার যৌন শক্তিকে চূর্ণ করে দিবে। (সহিহ বুখারি – ৫০৬৬)

হাদিসটিতে বিবাহ করতে অক্ষম অবস্থায় রোজার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হস্তমৈথুনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অথচ এটি রোজার থেকে সহজ ছিলো।

মাস্টারবেশন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান

তৃতীয়: স্বাস্থ্যের ক্ষতি। মাস্টারবেশনের বেশ কয়েকটি ক্ষতি প্রমাণিত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী হস্তমৈথুন স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে।

পুরুষের হাত মহিলার যোনির চেয়ে তুলনামূলক বেশি শক্ত ও রূঢ়। তাই হাত দ্বারা দীর্ঘমেয়াদী হস্তমৈথুনের ফলে পুরুষাঙ্গে সংবেদনশীলতার দুর্বলতা দেখা দেয়।

পশ্চিমাদের মধ্যে এটি একটি বিরাট রোগ। যেখানে অনেক লোক তার স্ত্রীকে রেখে চলে যায়। কারণ সে স্ত্রীর সাথে সহবাস থেকে হস্তমৈথুনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

সে অশ্লীল চলচ্চিত্র এবং ম্যাগাজিনের সাহায্যে তাঁর হাত দিয়ে হস্তমৈথুন করে সন্তুষ্টি লাভ করে। এটি বৈবাহিক জীবনে একটি ধ্বংসাত্মক রোগ।

যা পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট এবং দাজ্জালি মিডিয়ার কারণে আমাদের সমাজে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

একইভাবে মহিলার ক্ষেত্রে হস্তমৈথুনের ফলে যৌন অঙ্গগুলি – ভগাঙ্কুর, লেবিয়া ও যোনি বৃদ্ধি পায়। এ কারণে স্বামীর সাথে সহবাসের সময় সে আনন্দ বোধ করে না।

ডা. আনোয়ার আল-হামাদী বলেন – এই অভ্যাসের অনেক ক্ষয়ক্ষতি রয়েছে। যার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো – যৌন দুর্বলতা, লিঙ্গ উত্থানগত সমস্য, অকাল বীর্যপাত, যৌনাঙ্গ বাকা হয়ে যাওয়া।

ডা. মোহাম্মদ হেগাজী বলেন – চিকিৎসকদের এই কথাটি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, হস্তমৈথুন শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির দিকে ডেকে আনে।

যেহেতু এটি শরীরের স্বাভাবিক যৌনক্রীয়াকে নিষ্কৃত করে তোলে। হতাশার জন্ম দেয়, অনৈতিক পথে ধাবিত করে।

ডা. মোস্তফা আল-জারকা বলেছিলেন – “মেডিক্যাল সায়েন্স দ্বারা প্রমাণিত ক্ষতিকর জিনিস ইসলামি আইনে নিষিদ্ধ। এটি ফকিগণের সর্বসম্মত অভিমত।”

চতুর্থ: মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি। এটি অপরাধবোধের অনুভূতি জাগ্রত করে। কেননা এটি উচ্চ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে নিন্দনীয়।

আল-কুরতুবী বলেছিলেন – “হস্তমৈথুন একজন সাধারণ মানুষের কাছে অপমানজনক। সেটা একজন সম্মানি ব্যক্তি কীভাবে করতে পারে?”

হস্তমৈথুন মাকরুহ – অভিমত ও প্রমাণাদি

আহলে জহিরিদের মধ্যথেকে অনেকে হস্তমৈথুন হারাম হওয়াকে অস্বীকার করেন। তারা এটাকে কেবল মাকরুহ বলে মত দেন।

ইবনে হাজম জাহিরি হস্তমৈথুন সম্পর্কে “আল-মুহল্লা” গ্রন্থে বলেছেন:

“আমরা এটাকে মাকরুহ মনে করি। কারণ এটি শ্রেষ্ঠ নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্র পরিপন্থী। তা প্রশংসনীয় গুণ নয়।”

তাদের অভিমতের পক্ষে দালায়িল

১. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক কিতাবে ইবনু জুরাইজ আতা থেকে বর্ণনা করেন –

আতা – রাহিমাহুল্লাহ – হস্তমৈথুন মাকরুহ মনে করতেন। ইবনু জুরাইজ প্রশ্ন করেন এ বিষয়ে কি কোনো হাদিস আছে? আতা বলেন – আমি শুনিনি। ( মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক – ১৩৫৮৬)

২. ইবনু আব্বাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – কে এক ব্যক্তি বলে –

আমি আমার যৌনাঙ্গ দ্বারা খেলা করি। অবশেষে বীর্যপাত হয়। তিনি বলেন – এর থেকে কোনো বাঁদীকে বিয়ে করা উত্তম আর যিনা করার থেকে এটি উত্তম। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক – ১৩৫৮৮)

৩. আবিস শাআসা যায়দ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন –

এটা তো তোমার পানি। তুমি চাইলে তা নির্গত করতে পারো। ( মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক – ১৩৫৯১)

৪. মুজাহিদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন

আমাদের পূর্বসূরিরা তাদের যুবকদের হস্তমৈথুনের নির্দেশনা দিতেন। এভাবে মহিলারা (যৌনিতে) কোনো কিছু প্রবেশ করাতো। যাতে যিনা থেকে বিরত থাকতে পারে।

বর্ণনাকারী বলেন আমরা আব্দুর রাজ্জাককে জিজ্ঞাসা করলাম মেয়েরা কি প্রবেশ করাতো? তিনি বলেন নরম কোনো বস্তু। ( মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক – ১৩৫৯৩)

৫. ইবনবু জুরাইজ বর্ণনা করেন

আমর ইবনে ইবনে দিনার বলেছেন ‘ আমি হস্তমৈথুনে সমস্যা দেখিনা’। ( মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক – ১৩৫৯৪)

হস্তমৈথুন হালাল – অভিমত ও শর্ত

হানাফি ও হাম্বলি মাযহারের কিছু আলেম কেবল ব্যভিচারে পতিত হওয়ার আশংকা থাকা অবস্থায় হস্তমৈথুনের অনুমতি দিয়েছেন।

কেননা দুটি ক্ষতিকর দিক সামনে আসলে অপেক্ষাকৃত বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে অপেক্ষাকৃত ছোট ক্ষতি গ্রহণ করা বৈধ।

তবে শর্ত হলো একাজটি অভ্যাসে পরিণত করা যাবে না এবং এটি যৌনস্বাদ উপভোগের ইচ্ছয় করতে পারবে না।

একইভাবে যদি স্ত্রী স্বামীর যৌনাঙ্গে হাত দ্বারা বীর্যপাত ঘটায় বা স্বামী নিজ স্ত্রীর যৌনিতে আঙুল ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করে তবে সেটা হারাম নয়।

হস্তমৈথুন কি হারাম

হস্তমৈথুন কি হারাম – অভিমত পর্যালোচনা

এক: আমারা দেখেছি যারা হস্তমৈথুনকে হারাম বলেছেন তাদের দাবির পক্ষে স্পষ্টভাবে কুরআনের কোনো আয়াত বা হাদিস পেশ করতে পারেননি।

তারা কেবল আয়াত ও হাদিসের ‘মাফহুম মুখালিফ’ বা বিপরীত অর্থ দ্বারা এটিকে হারাম বলার চেষ্টা করেছেন।

অথচ যে কোনো বিষয়কে হারাম বলার জন্য শক্তিশালী দলিল থাকতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো শক্তিশালী দলিল নেই।

দুই: আহলে জাহিরি আলেমগণ তাদের মতের পক্ষে বেশ কিছু উক্তি পেশ করেছেন। কিন্তু তাদের পেশকৃত একটি দলিলই শুদ্ধ নয়।

তাদের পেশকৃত প্রতিটি বর্ণনার বর্ণনাকারীর সূত্রে বিচ্ছিন্নতা অথবা মিথ্যুক বর্ণনাকারী রয়েছে। যার দ্বারা প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার যোগ্য নয়।

তিন : যারা যিনার লিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকলে হস্তমৈথুন বৈধ বলেছেন তাদের মতের পক্ষে একটি বিশুদ্ধ আছার রয়েছে। তাই এ মতটি গ্রহণ করতে অসুবিধা নেই।

অন্যদিকে স্বাভাবিক অবস্থায় হস্তমৈথুন হারাম হওয়ার পক্ষে যদিও কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট দলিল নেই।

কিন্তু যে দলিলগুলো পেশ করা হয়েছে তার সাথে মেডিকেল সাইন্স দ্বারা প্রমাণিত ক্ষতিগুলো যোগ করলে মতটি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে যায়।

তাই বলা যায় যিনায় লিপ্ত হওয়া আশংকা না থাকলে কেবল যৌনস্বাদ ভোগের ইচ্ছায় হস্তমৈথুন হারাম। কেননা এর দ্বারা কেবল পাপপ হয় বরং ধীরেধীরে যৌন ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন –

অনুবাদ: কারো ক্ষতি করা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে ইসলাম সমর্থন করে না।

কিন্তু স্বামী স্ত্রী পরস্পর হস্তমৈথুন বৈধতা দানকারী অভিমতের উপর একটি প্রশ্ন থেকে যায়।

যদি মেডিকেল সাইন্সে হস্তমৈথুনের কারণে যৌন ক্ষতি হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। যেমনটা হস্তমৈথুন হারাম মত প্রদানকারীরা বলেছেন।

তাহলে সে ক্ষতিটা স্বামী স্ত্রী পরস্পর হস্তমৈথুনের দ্বারা হতে পারে। এরপরও এটা বৈধ হয় কীভাবে?

এর উত্তর হলো কেবল হস্তমৈথুনের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে হারাম বলা হয়নি। এটি হারাম বলার পেছনে কুরআন ও হাদিস থেকে দলিলও ছিলো।

স্বামী স্ত্রী পরস্পর হস্তমৈথুনকালে নিষেধাজ্ঞার সেই বাণীগুলো বিদ্যমান থাকে না। তাই এটি হারাম হবে না।

তদুপরি যেহেতু এর দ্বারা যৌন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তাই স্বামী স্ত্রী তাদের যৌন জীবনে এটিকে অভ্যাস ও অনিবার্য কর্মে পরিণত করতে নিষেধ করা হয়।

1 thought on “হস্তমৈথুন কি হারাম? ইসলামে হস্তমৈথুনের বিধান”

  1. বাহ দারুন তো আর্টিকেলটি। ধন্যবাদ

    Reply

Leave a Comment