সফর অবস্থায় নামাজ ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসায়িল

সফর একটি কষ্টসাধ্য কাজ। যার দরুন আল্লাহ তায়ালা সফর অবস্থায় নামাজ রোজাসহ কিছু শরয়ি বিধি-বিধান সহজ করে দিয়েছেন।

এই ব্লগে সফর অবস্থায় নামাজ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসায়িল আলোচনা করছি।

কিন্তু সফরের নামাজ আদায়ের পন্থা-অবস্থা ও সময় নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ হাদিস নাই।

তাই ধাবিত হতে হয়েছে সাহাবায়ে কেরাম থেকে সংরক্ষিত আসারের দিকে। আর সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আসারগুলোর মধ্যে রয়েছে পরস্পর বিরোধি বর্ণনা।

যার ফলে ফিকাহবিদগণ সফরের সালাত সংক্রান্ত মাসায়িলের সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে মতভেদ। যা কোনো কোনো দিক থেকে পৌঁছে গেছে জটিলতার সীমায়।

তদুপরি এই জটিলতাকে সহজ ও সঠিকভাবে পরিবেশনের মানসে নিন্মে প্রশ্ন আকারে সফর অবস্থায় নামাজ নিয়ে কয়েকটি মাসায়িল আলোচনা করছি।

সফর অবস্থায় নামাজ কসর করার হুকুম কী

প্রশ্ন – সফর অবস্থায় নামাজ কসর করার হুকুম কী ? মুসাফির ব্যক্তি কোন কোন অবস্থায় ও কোন কোন ওয়াক্তের নামাজ কসর করে পড়তে পারবে ?

উত্তর – মুসাফির ব্যক্তি যখন একাকি সালাত আদায় করবেন বা অন্য মুসাফির ইমামের পেছনে ইক্তিদা করবেন বা নিজে ইমাম হবেন –

এই তিন অবস্থায় কেবল চার রাকাত বিশিষ্ট্য সালাত অর্থাৎ যুহর, আসর ও এশা, কসর করে দুই রাকাত আদায় করতে পারবেন।

ইসা ইবনে হুসাইন তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন –

‘আমি ইবনে উমারের সাথে একটি সফরে ছিলাম। সেখানে তিনি যুহর ও আসরের সালাত দুই রাকাত করে আদায় করেন।’ ( নাসায়ি-১৪৫৮ )

মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – ইমামতি করে দুই রাকাত সালাত আদায় করার পর বলেন –

‘হে শহরবাসী, তোমরা চার রাকায়াত পূর্ণ করে নাও, কেননা আমরা মুসাফির।’ ( আবু দাউদ- ১২৩১ )

কিন্তু তিনি যদি মুকিম ইমামের ইক্তিদা করেন তাহলে কসর করতে পারবেন না। বরং তখন পরিপূর্ণ চার রাকায়াতই আদায় করতে হবে।

অনুরূপভাবে চার রাকায়াত থেকে কম সালাত অর্থাৎ ফজর ও মাগরিবে কোনো অবস্থায়ই কসর করতে পারবেন না।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন

ইমাম বানানো হয় তার অনুসরণ করার জন্য। কাজেই তার সাথে বিরোধ করো না।’ ( সহিহ বুখারি-৬৮৯ )

ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন –

‘ইবনে উমার – রাদিয়াল্লাহু আনহু – ( সফরে থাকা অবস্থায় ) ইমামের ইক্তিদা করে সালাত আদায় করলে চার রাকায়াত পড়তেন আর একাকি আদায় করলে দুই রাকায়াত পড়তেন।’ ( সহিহ মুসলিম-৬৯৪ )

আয়েশা – রাদিয়াল্লাহু আনহা – বলেন

প্রাথমিককালে মাগরিব ছাড়া বাকি সালাত দুই রাকাত করে ফরজ করা হয়েছিলো। কেননা মাগরিব হলো দিনের বেজোড়।’ ( মুসান্নাফু ইবনু আবি শায়বা – ৬৭৭৪ )

ইমাম নববি বলেন –

‘সফরের মধ্যে যুহর আসর ও এশার সালাতে কসর করা জায়েয। কিন্ত সফর বা বাড়িতে অবস্থানকালে কখনোই ফজর ও মাগরিবের সালাতে কসর জায়েয নেই।

এ কথা ইজমার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।’ (আল মাজমুউ শারহুল মুহায্যাব – ৪৩২২)

সফর অবস্থায় নামাজ কসর করার হুকুম – ফিকাহবিদগণের মধ্যে সফররত অবস্থায় সালাতে কসর করার হুকুম নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

তবে দালায়িল ও সমসাময়িক বিষয় আশয় বিবেচনায় সফর অবস্থায় সালাতে কসর করাটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা হওয়ার অভিমতটি গ্রহণযোগ্য প্রতিয়মাণ হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন –

‘যখন তোমরা পৃথিবীতে সফরে বের হও তখন সালাত কসর করে নিলে কোনো ক্ষতি নেই।’ ( সুরা নিসা-১০১ )

সফরের নামাজ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন –

‘এটা সাদাকা, আল্লাহ তায়ালা এ মাধ্যমে তোমাদের উপর সাদাকা করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর সাদাকা গ্রহণ করো।’ ( সহিহ মুসলিম-১৬০৫ )

এই হাদিসটি প্রমাণ করে সফরে সালাত কসর করে পড়া ওয়াজিব নয়। কেননা কসর আল্লাহ তায়ালার দেওয়া সাদাকা বা অনুগ্রহ।

আর সাদাকা গ্রহণ করা বা না করার অধিকার সাদাকা গ্রহীতার ইচ্ছাধীন থাকে। কিন্তু যদি কসরকে ওয়াজিব বলা হয় তাহলে তার মধ্যে আর সাদাকার অর্থ বাকি থাকবে না।

ইমাম বুখারি – রাহিমাহুল্লাহ – বর্ণনা করেন আব্দুর রাহমান ইবনে ইয়াজিদ বলেছেন –

‘উসামান ইবনে আফ্ফান – রাদিয়াল্লাহু আনহু – ( হজ্জের সফরে ) আমাদের নিয়ে মিনায় চার রাকায়াত পড়েছেন।’ ( সহিহ বুখারি-১০৩৪ )

এই হাদিসটিও প্রমাণ করে সফরে সালাতে কসর করা ওয়াজিব নয়। কেননা যদি তা ওয়াজিব হতো তাহলে উসমান – রাদিয়াল্লাহু আনহু – হজ্জের মৌসুমে মদিনা থেকে সফর করে মিনায় গিয়ে চার রাকায়াত না পড়ে দুই রাকাত পড়তেন।

মুসা ইবনে সালামা বর্ণনা করেন –

‘আমরা ইবনে আব্বাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু -‘র সাথে মক্কায় সফরে ছিলাম, তখন আমি তাকে বললাম –

আমরা আপনাদের সাথে থাকলে চার রাকায়াত পড়ি আর আমাদের তাবুতে ফিরে গেলে দুই রাকায়াত পড়ি।

তখন ইবনে আব্বাস বলেন – এটাই আবুল কাসিম (মুহাম্মাদ) – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -‘র সুন্নাত।’ ( মুসনাদু আহমাদ-১৮৬২ )

উল্লেখিত দালায়িল ছাড়াও আরো কিছু দালায়িল রয়েছে যার ভিত্তিতে প্রমাণ হয় সফরে নামাজ কসর করা ওয়াজিব নয়।

কিন্তু স্বার্বিকভাবে হাদিস-আসার এবং রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – ও সাবাবায়ে কেরামের আমলের প্রতি লক্ষ্য করলে সফরে নামাজ কসর করার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়, তাই এটাকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলাই যুৎসই হবে।

বিশেষ নির্দেশিকা

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য শরিয়তকে জটিল করেননি। শরিয়তের বিধানগুলো আমাদের বুঝার ও আমল করার সাধ্য অনুযায়ী আরোপ করেছেন।

তদুপরি আমাদের অনুধাবন ও ব্যাখ্যার কারণে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এ জন্যই সফরের সালাতের মাসায়িল অনেক সময় বাহ্যিকভাবে একটু জটিল মনে হয়।

কিন্তু একটু চিন্তা করলে দেখা যাবে আসলে তা জটিল নয়। কেননা পাঁচ ওয়াক্তের সালাত থেকে কসরের অবকাশ আছে কেবল তিন ওয়াক্তে।

আবার এই তিন ওয়াক্তে যদি মুকিম ইমামের ইক্তিদা করা হয় তখনও কসরের অবকাশ থাকে না।

বাকি থাকে একাএকা সালাত আদায় করা এবং নিজে ইমাম হয়ে বা মুসাফির ইমামের ইক্তিদা করে সালাত আদায় করা – এই তিনটি অবস্থা।

এই তিনটি অবস্থার প্রথমটি তখনই আসবে যখন সফররত শহরে বা এলাকায় জামাতে সালাত আদায় করার সুযোগ থাকবে না।

কিন্তু যদি সফররত এলাকায় জামাতে সালাত আদায়ের সুযোগ থাকে তখন জামাত ছেড়ে একাএকা সালাত আদায় করা বৈধ হবে না।

কেননা জামাতে নামাজ আদায় করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও ফজিলতপূর্ণ একটি কাজ।

সফরের কারণে জামাত ছেড়ে একাএকা সালাত আদায় করার অনুমোদন শরিয়ত দেয়নি। এভাবে জামাতে সালাত না পড়ে জামাতের ফজিলত থেকে বঞ্চিত হওয়া কোনো মুমিনের জন্যই বাঞ্ছনীয় নয়।

তাই সফররত অবস্থায় চার রাকয়াত না পড়ে দুই রাকাত পড়ার অবকাশ থাকলেও জামাত ছাড়ার অবকাশ না থাকার দরুন মুকিম ইমামের ইক্তিদা করতে হবে।

আর মুকিমের ইক্তিদা করে নিলে সফরের মাসায়িলও আসবে না। এখন বাকি থাকে যে এলাকায় জামাতে সালাতের ব্যবস্থা নেই

বা নিজে ইমাম হয়ে বা মুসাফির ইমামের ইক্তিদা করে সালাত আদায় করার অবস্থা।

এই অবস্থাগুলো খুব কমই অস্তিত্বলাভ করবে। কেননা বিশ্বে মুসলিম জনবসতিগুলোর মধ্যে এমন জায়গা খুব কম পাওয়া যাবে যেখানে জামাতে সালাত আদায়ে জন্য মসজিদের ব্যবস্থা নেই।

অনুরূভাবে নিজে ইমাম হয়ে সালাত আদায় করা বা অন্য মুসাফির ইমামের ইক্তিদা করে সালাত আদায় করার ঘটনাও খুব কম সময় ঘটে থাকে।

তদুপরি যদি কখনো এই তিনটি অবস্থার কোনোটি সামনে এসে যায় আর কোনো কারণে সফরের মাসায়িল বুঝতে জটিলতা থাকে তাহলেও কসর না করে পূর্ণ সালাত আদায় করার অবকাশ রয়েছে।

কেননা কসর করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা আর সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছাড়া গোনাহ নয়। কিন্তু সুন্নত ছাড়া কাম্য নয়।

তাই কেউ এই তিনটি অবস্থা থেকে কোনো অবস্থার সম্মুখিন হলে যাতে সুন্নতের উপর আমল করতে পারেন সে জন্য নিম্নে সফর সংক্রান্ত আরো কিছু মাসায়িল আলোচনা করছি।

সফর অবস্থায় নামাজ কসর করার কারণ কী

প্রশ্ন – সফর অবস্থায় নামাজ কসর করার কারণ (সবব) কী? সফরের কারণে অর্জিত কষ্ট ? না কি নিছক সফরটাই কারণ (সবব)?

বর্তমান সময়ে বিমান বা দ্রতগামী যানবাহনের মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা এক শহর থেকে অন্য শহরে অত্যন্ত আরাম আয়েশের সাথে সফরের ব্যবস্থা রয়েছে।

এতে অনেক সময় কষ্ট প্রায় অনুভবই করা যায় না। তদুপরি কি সালাতে কসর করা বৈধ ?

উত্তর – আল্লাহ তায়ালা ও রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – সালাত কসর ( চার রাকাত বিশিষ্ট সালাত দুই রাকায়াত ) করে আদায় করার হুকুমকে সফরের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন।

যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন –

‘আর যখন তোমরা পৃথিবীতে সফরে বের হও তখন সালাত কসর করে নিলে কোনো ক্ষতি নেই।’ ( সুরা নিসা – ১০১ )

রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেছেন-

‘ সফরের সালাত দুই রাকায়াত ’ ( নাসায়ি – ১৪১৯ )

অপর হাদিসে বলেছেন –

‘আল্লাহ তা’য়ালা মুসাফিরের উপর থেকে অর্ধেক সালাত মাফ করে দিয়েছেন।’ (নাসায়ি-২২৭৫)

তাই সর্ব অবস্থায় সালাত কসর করার কারণ হবে সফর। চাই সফরের কারণে কষ্ট হোক বা না হোক।

তাছাড়া মুকিম (নিজ বাড়িতে অবস্থানরত) ব্যক্তির জন্য সালাতে কসর করা বৈধ নয়। যদিও অনেক সময় মুকিমের জন্য সালাত আদায় কষ্টকর হয়।

যদি সালাতে কসর করার কারণ কষ্ট হতো তাহলে যে মুকিমের জন্য সালাত আদায় কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় তার জন্যও কসর করা বৈধ হতো।

সুতরাং বর্তমান উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা গ্রহণ করে সফর করার ফলে সফরকারীর শরীরে কষ্ট-ক্লান্তি না আসলেও সালাতে কসর করতে পারবে।

আরবের বরেণ্য ফিকাহবিদদের নিয়ে গঠিত ফিকহি সংস্থা ‘আল লাজন্নাতুত দায়িমা’ কে আলোচিত প্রশ্নের অনুরূপ একটি প্রশ্ন করা হলে –

তারা এর উত্তরে বলেন –

‘যে দূরত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার কারণে নামাজ কসর করা সুন্নত। অনুরূপ কারণে মুসাফিরের জন্য রোজা না রাখার অবকাশ রয়েছে।

চাই সে কম সময়ে সফর করুক বা বেশি সময়ে – এক ঘন্টা বা তার চেয়ে কম বা বেশি সময়ে হোক। চাই কষ্ট হোক বা না।

কেননা সফরের বৈশিষ্ট হলো কষ্ট হওয়া। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কষ্ট না হওয়াটা আল্লাহ তায়ালা কর্র্তৃক তাঁর বান্দার প্রতি অনুগ্রহ।’ (ফাতাওয়া জান্নাতুত দায়িমা,৮/১২৭)

মুসাফির কাকে বলে কতোটুকু জায়গা অতিক্রম করলে মুসাফির হয়


প্রশ্নমুসাফির কাকে বলে ? কতোটুকু পরিমাণ জায়গা অতিক্রম করলে একজন মানুষ সফরকারী হিসাবে গণ্য হবে এবং তার জন্য সালাতে কসর করা বৈধ হবে ?

উত্তর – কোনো ব্যক্তি ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নিলে একজন মানুষ মুসাফির হিসাবে গণ্য হয়ে যাবে এবং সে নামাজ কসর করতে পারবে।

রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেছেন –

‘তোমরা চার ‘বুরদ’ থেকে কম ভ্রমন করলে সালাতে কসর করো না।’ (বুলুগুল মারাম-৪৪০)

ইমাম বুখারি -রাহিমাহুল্লাহ- বর্ণনা করেন –

‘ইবনে উমার ও ইবনে আব্বাস – রাদিয়াল্লাহু আনহুম – চার ‘বুরদ’ অতিক্রম করলে নামাজ কসর করতেন এবং রোজা ছাড়তেন।

আর (চার বুরদ হলো) ষোল ফারসাখ।’ ( সহিহ বুখারি, বাব – ফি কাম ইউকসারুস সালাতু )

ইমাম মালিক – রাহিমাহুল্লাহ – তাঁর মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন –

‘ইবনে উমার – রাদিয়াল্লাহু আনহু – যাতুন নুসুবের দিকে সফরকালে নামাজ কসর করেন।

ইমাম মালিক -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন, যাতুন নুসুব ও মদিনার মধ্যে দূরত্ব চার ‘বুরদ’।’ (মুয়াত্তা মালিক-৪৫১)

এক ‘বুরদ’ সমান ৪ ফারসাখ। সুতরাং ৪ ‘বুরদ’ সমান হবে ষোল ‘ফারসাখ’। আর এক ফারসাখে হয় ৩ মাইল সুতরাং ষোল ফারসাখে হবে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার।

মুসাফির কতো দিন পর্যন্ত নামাজ কসর করবে

প্রশ্নমুসাফির কতো দিন পর্যন্ত নামাজ কসর করতে পারবে ?

উত্তর – মুসাফির কোনো শহরে পনেরো দিন বা তাঁর চেয়ে অধিক সময় অবস্থানের নিয়ত করে নিলে নামাজ কসর করতে পারবেন না। বরং তাকে পূর্ণ সালাত আদায় করতে হবে।

আর যদি পনোরো দিনের চেয়ে কম সময় অবস্থনের নিয়ত করেন তাহেল সালাতে কসর করতে পারবেন।

ইবনে আব্বাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বর্ণনা করেন –


‘রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- মক্কায় পনেরো দিন অবস্থান করে দুই রাকায়াত করে সালাত আদায় করেছেন।’ (নাসায়ি-১৪৫২)


ইবনে আব্বাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন –

‘যে পনেরো দিন অবস্থান করবে সে পূূর্ণভাবে সালাত আদায় করবে। ’ (তিরিমিজি-৫৩৮)


কিন্তু মুসাফির ব্যক্তি যদি কোনো নিয়তই না করেন তাহলে সফরে থাকা অবস্থায় পুরো সময়টাই কসর করে সালাত আদায় করতে পারবেন।

চাই তা পনেরো দিনের কম হোক বা বেশি- এক মাস, দুই মাস বা এক বছর বা তারও অধিক হোক না কেন।

নাফে – রাহিমাহুল্লাহ – বর্ণনা করেন –

‘ইবনে উমার -রাদিয়াল্লাহু আনহু- আযারবাইজানে ছয় মাস অবস্থানকালে নামাজ কসর করে আদায় করেন।

আর তিনি বলতেন, যখন আমি অবস্থানের নিয়ত করবো তখন পূর্ণভাবে সালাত আদায় করবো।’ (মুসান্নাফু আব্দুর রাজ্জাক-৪৩৩৯/সহিহ)

আবুল মিনহাল বর্ণনা করেন-

‘আমি ইবনে আব্বাস -রাদিয়াল্লাহু আনহু- কে বললাম আমি এক বছর যাবত মদিনায় আছি কিন্তু অবস্থানের নিয়ত করিনি।

তিনি বলেন, তুমি দুই রাকায়াত করে সালাত আদায় করো।’ (মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বা-৮২৮৫/ সহিহ)

মাসরুক -রাহিমাহুল্লাহ- থেকে আবি ওয়াইল বর্ণনা করেন-

‘আমি তাঁর (মাসরুকের) সাথে সিলসিলা নামক স্থানে অবস্থানকালে দুই বছর পর্যন্ত দুই রাকাত করে সালাত আদায় করি।’ (মুসান্নাফু ইবনু আবি শায়বা-৮২৯০)

মুসাফিরের একাধিক বাড়ি থাকলে কীভাবে সালাত কসর করবে

প্রশ্ন – কোনো ব্যক্তি যদি কয়েকটি শহরে একটি করে বাড়ির মালিক হয় যেমন লন্ডনে আছে তার নিজস্ব মালিকানাধীন একটি বাড়ি।

অনুরূপভাবে ঢাকায় ও সিলেটে তার একটি করে বাড়ি রয়েছে, তাহলে সেই ব্যক্তি তার উক্ত বাড়িগুলোতে ভ্রমনকালে কীভাবে নামাজ আদায় করবে?


উত্তর – যদি কোনো ব্যক্তির বিভিন্ন দেশে বা শহরে নিজস্ব মালিকানাধীন একাধিক বাড়ি থাকে যেমন লন্ডনে একটি, ঢাকায় একটি ও সিলেটে আরেকটি বাড়ি থাকে।

আর তিনটি বাড়িতেই তার তিন জন স্ত্রীকে রাখে তাহলে এই বাড়িগুলো তার জন্য ‘অতনে আসলি’ বিবেচত হবে।

অনুরূভাবে যদি সে একাধিক বাড়ি নিজে বসবাসের ইচ্ছায় বানায়, যে রকম বর্তমানে আরবে শীত ও গরমের মৌসুমে বসবাসের জন্য অনেকে আলাদা আলাদা বাড়ি বানিয়ে থাকেন –

তাহলে সেই বাড়িগুলো তার জন্য ‘ওতনে আসলি’ বা মূল বাড়ি হিসাবে বিবেচিত হবে। এসব বাড়িতে সে পূর্ণ সালাত আদায় করবে।

আর যদি এমন কোনো বাড়ি থাকে যেখানে শুধু বসত ভিটা বা ঘর রয়েছে কিন্তু সেখাসে তার কোনো স্ত্রী বসবাস করে না বা নিজেও বসবাসের ইচ্ছা রাখে না।

তাহলে সেই বাড়ি তার জন্য ‘ওতনে আসলি’ হবে না। তাই সেই বাড়িগুলোতে সে নামাজ কসর করতে পারবে।

কেননা রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – মদিনা থেকে মক্কায় সফর করার পর সেখানে তাঁর ভিটামাটি বাকি থাকার পরও সালাতে কসর করেছেন।

মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- ইমামতি করে দুই রাকাত সালাত আদায় করার পর বলেন –

‘হে শহরবাসী! তোমরা চার রাকায়াত পূর্ণ করে নাও, কেননা আমরা মুসাফির।’ (আবু দাউদ-১২৩১)

আল মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাতিল কুয়িতিয়্যায় বলা হয় –

‘ অতনে আসলি’(মূল বাড়ি)এক বা একের অধিক হওয়া বৈধ রয়েছে। এটা এভাবে যে, যেমন তার পরিবার- স্ত্রী ও বাড়ি রয়েছে দুই বা দুয়ের অধিক শহরে।

আর তার পরিবার সেখান থেকে বাহির হওয়ার ইচ্ছা নেই। তখন সে যদি তার এক স্ত্রীর কাছ থেকে অন্য স্ত্রীর কাছে আসে।

এমনকি সেই শহর থেকে মুসাফির হিসাবে বাহির হয় যেখানে তার এক স্ত্রী বসবাস করছে এবং অপর শহরে প্রবেশ করে যেখানে তার অন্য স্ত্রী বসবাস করছে।

তাহলে সে অবস্থানের নিয়ত ছাড়াই মুকিম হয়ে যাবে। ( আল মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাতলি কুয়িতিয়্যাহ-২৭/২৬৭ )

হাশিয়াতু ইবনি আবিদিনে বলা হয় –

‘আর যদি দুই শহরে তার (দু’জন) স্ত্রী বসবাস করে। তাহলে এ-দুটি শহরের যে কোনোটিতে প্রবেশ করলেই মুকিম হয়ে যাবে।

কিন্তু যদি এ-দুটি শহরের কোনোটিতে তার স্ত্রী মারা যায় আর ঘর বা জমি বাতি থাকে তাহলে কেউ কেউ বলেছেন, সেই স্থানটি তার জন্য ‘অতনে আসলি’ হিসাবে বাকি থাকবে না।

কেননা কোনো স্থান ‘অতনে আসলি’ হওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হলো সেখানে তার স্ত্রী থাকা।

যেভাবে কোনো শহরে যদি সে স্ত্রী নিয়ে বসবাস করে কিন্তু সেখানে তার স্থায়ী বাড়ি না থাকে (তবুও সে মুকিম হয়ে যায়)।

আর কেউ কেউ বলেছেন, ‘অতনে আসলি’ হিসাবে বাকি থাকবে।’ (হাশিয়াতু ইবনি আবিদিন-২/১৩২)

লেখক – শাহ মুহাম্মাদ সুহাইল
ব্লগ নাম্বার – ১৯

Leave a Comment