বিট কয়েন কি হারাম? বিস্তারিত আলোচনা

বিট কয়েন কি হারাম? যখন একটি বিট কয়েনের মূল্য প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। যখন প্রতিনিয়ত বাড়ছে ইলেকট্রিক কয়েনের জনপ্রিয়তা।

তখন এই প্রশ্নটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠছে। বিট কয়েন কি হারাম? ইসলামি স্কলারগণ এ রকম ক্রিপ্টকারেন্সির ব্যাপারে কি অভিমত পেশ করেছেন?

আজকের পোস্টটিতে বিট কয়েন কি হারাম এই বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আলোচনা করার চেষ্টা করছি। আশা করি এটি আপনার জন্য উপকারী হবে।

ব্লগটিতে থাকছে

বিট কয়েন কি?

বিটকয়েন একটি ক্রিপ্টকারেন্সি ভিত্তিক কয়েন । ক্রিপ্টকারেন্সি মানে হলো গোপন মুদ্রা ব্যবস্থা।

এটি যেহেতু অজ্ঞাত স্থান থেকে পরিচালিত হয় এবং ধরা ছোঁয়া যায় না তাই হয়তো এমন নাম করণ করা হয়েছে।

বিট কয়েন ২০০৮ ও ২০০৯ সালের দিকে যাত্রা শুরু করে। কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে নেয়।

এই পোস্টটিতে বিট কয়েন কি তা নিয়ে আমি ডিটেলস আলোচনা করেছি। বিটকয়েনের আদি অন্ত জানতে চাইলে পড়তে পারেন।

বিট কয়েন কীভাবে কাজ করে

বিটকয়েন একাউন্টে কারেন্সি সিস্টেম মূলত ব্লকচেইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ব্লকচেইন হলো কতোগুলো ব্লক যা একটির সাথে অন্যটি সম্পৃক্ত থাকে।

প্রতিটি একাউন্ট ব্লকচেইন সিস্টেমে একটির সাথে অপরটি যুক্ত থাকে। তাই একটি একাউন্টে কোনো ট্রানজেকশন হলে অন্যগুলোও এটির সাথে আপডেট নেয়।

বিট কয়েন ইদানিং বড় বড় সুপার শপ থেকে নিয়ে শপিং মল রেস্তুরা হোস্টেল সকল কোম্পানি এক্সেপ্ট করে নিচ্ছে। তাই এর দ্বারা প্রায় সকল কাজই করা সম্ভব।

তবে বাংলাদেশ সরকারিভাবে বিট কয়েন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই কয়েন দ্বারা লেনদেনকারী ব্যক্তির জলে ও জরিমানা হতে পারে।

বিট কয়েন কি হারাম?

ইসলাম স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাকে পণ্যের বিপরীতে মূল মুদ্রা হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। তাই ইসলামে মুদ্রা ব্যবস্থা বলতে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রাকে বুঝানো হয়ে থাকে।

ইসলামের সূচনা থেকে নিয়ে সব খলিফা ও সুলতানদের আমলে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ছিলো সর্বসাকুল্য।

কাগজের মুদ্রা ব্যবস্থা আসার আগ পর্যন্ত স্বর্ণের বা রূপার কয়েন ছিলো সকল মুসলিমের মুদ্রা। কাগজের মুদ্রার প্রচলন হওয়ার পর থেকে সেটা আর থাকেনি।

কাগজের মুদ্রা গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পেছনে যে কারণটি ছিলো সেটি হলো, গ্রাহকের হাতে থাকে কাগজের মুদ্রাটি কেবল মূল স্বর্ণ বা রৌপ মুদ্রার অভিডেন্স।

এর অর্থ হলো গ্রাহকের হাতে থাকা কাগজের মুদ্রার বিপরীতে জাতীয় ব্যাংকে স্বর্ণ বা রৌপ্য গচ্ছিত রয়েছে। তার প্রমাণ হিসাবে গ্রাহক কেবল কাগজকের এই নোটগুলো বহন করছে।

এ জন্যই কাগজের নোটের মধ্যে লেখা থাকে ‘ চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে।

সেই সাথে মূল মুদ্রা দ্বারা যেসব কাজ করা যেতো এই কাগজের মুদ্রা দ্বারা সে সব কাজ কারার এখতিয়ার জাতীয় ব্যাংক দিয়ে রেখেছে।

চুর ডাকাত ছিনতাইকারীর হাত থেকে নিজের অর্থগুলোকে রক্ষা করার একটি কার্যকরী উপায় হয়ে ওঠে কাগজের মুদ্রা। তাই সকলে এটি গ্রহণ করে নেয়।

যে সব কারণে বিট কয়েন হারাম

১. আমরা যদি বিট কয়েনের দিকটি লক্ষ করি তাহলে দেখবো এর বিপরীতে কোনো ব্যাংকে কোনো ধরণের স্বর্ণ গচ্ছিত নেই।

এটা কেবল একটি ইলেকট্রিক ডিভাইসে প্রদর্শিত কিছু সংখ্যা ও তার দ্বারা লেনদেনের সুবিধা প্রদান করে মাত্র।

২. পৃথিবীতে প্রচলিত কাগজের সকল মুদ্রার মূল্য সব সময় একই থাকে। কিন্তু বিটকয়েন তার বিপরীত। তার মূল্য প্রতি সেকেন্ডে আপ ডাউন হতে থাকে।

এ জন্য গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথ উন্মুক্ত রয়েছে এমন কোনো পন্থাকে সাপোর্ট করে না।

৩. বিট কয়েনের জামানত গ্রহণকারী কোনো ব্যাংক নেই। তাই এই কয়েনটির অপ্রত্যাশিত ক্ষতির ভর্তুকি দেওয়ার কেউ থাকে না।

৪. বিট কয়েন কারা উদ্ভাবন করেছে সেটা এখনও অজানা। মানুষের অর্থ সম্পদের ঠিকাদার কারা সেটাই যদি জানা না থাকে তবে ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা বেশ শক্ত হয়ে যায়।

আর ইসলাম আমাদের ধোঁকা খাওয়া ও ধোঁকা দেওয়া থেকে নিষেধ করেছে।

৫. বিট কয়েন দ্বারা কে কোথায় থেকে ট্রানজাকশন করেছে সেটা জানা যায় না। তাই এর দ্বারা সহজে অপরাধ সংগঠিত করা যায়।

৬. বিট কয়েনর দ্বারা ধোঁকা খাওয়া ও ধোকা দেওয়া সহজ। তাই এই কয়েন দ্বারা লেনদেন ধোঁকার দোয়ার খুলে দেয়।

বিটকয়েনের বিষয়ে উপরে আলোচিত সবকটি পয়েন্টসহ আরো অনেক কারণ রয়েছে যা এই কয়েনটি হারাম হওয়ার দাবি করে।

তাছাড়া বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ একটিকে নিষিদ্ধ করে রেখেছে।

এদিক থেকে বিটকয়েনে লেনদেন দেশিয় আইনে তো অবশ্যই এটি একটি অপরাধ।

ইসলামি স্কলারদের অভিমত

বিট কয়েনকে বিশ্বের প্রশিদ্ধি বেশ কয়েকটি দারুল ইফতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

মুফতি তাকি উসমানি

তাদের মধ্যে মিসর সৌদি আরব ও দারুল উলুম দেওবন্দ বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।

তাছাড়া শায়খ ইউসুফ আল কারদাভি শায়খ সালেহ আল ফাওদান প্রমুখ ক্রিপ্টকারেন্সি ও বিট কয়েন নিয়ে শংকা প্রকাশ করছেন।

সব মিলিয়ে আমরা দেখতে পাই ইসলামে মুদ্রা ব্যবস্থার ভিত্তি হলো হুবহু স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা হওয়া অথবা তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া।

কিন্তু বিট কয়েন না সরাসরি স্বর্গ ও রৌপ্য মুদ্রা হতে পারে আর না তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। তাই এটি বৈধ বা হালাল হতে পারে না।

একইভাবে ইসলামি কারেন্সি ব্যবস্থা জনসাধারণ সবার কাছে সমান তালে প্রশিদ্ধি ও ব্যবহার থাকা কাম্য।

কিন্তু বিক কয়েন একদিক থেকে বিশ্বের সকল দেশে সকল মানুষের কাছে এখনো পরিচিতি লাভ করতে পারে নি।

অন্যদিকে এটি দ্বারা লেনদেন করা সবার দ্বারা সম্ভবও নয়। কেননা অনেক দেশে বহু মানুষের ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করা ও বিট কয়েন লেনদেনের মতো শিক্ষা নেই।

তাই এই কয়েনটি সবার কাছে সমান তালে ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতায় সমনা হতে পারেনি। এজন্য এই কয়েনটি হারাম।

মোট কথা বিটকয়েন হারাম হওয়ার কারণ অনেক। সবকটি কারণ ও দিক বিবেচনায় বিট কয়েন হারাম।

বিট কয়েন ও শেষ কথা

বিটকয়েনের আলোচনা থেকে আমরা জেনে এসেছি যে এই কয়েনটি হারাম। কিন্তু আমাদের বঝা দরকার এটি আসলে সত্তাগতভাবে হারাম নয়।

যেমন মদ বা শুয়রের মাংস। বরং এই কয়েনটি সত্তাগতভাবে হালাল আছে। কিন্তু প্রাসঙ্গিক কারণে হারাম হয়েছে।

যদি কোনো সময় এমন হয় যে, বিশ্ব ব্যাংক কয়েনটিকে গ্রহণ করে নেয়। তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটার ভর্তুকি তারা দেবে বলে ঘোষণা করে।

সেই সাথে অন্যান্য যে অসংগিগুলো আছে তা দূর করা হয় তবে সেটা আর হারাম থাকবে না।

ইমাম মালিক – রাহিমাহুল্লাহ – বলেছেন মানুষ যে জিসিনকেই সম্মিলিতভাবে তাদের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করে নিবে সেটাই তাদের মুদ্রা বলে পরিগণিত হবে।

চাই সেটা চামড়াও হোক না কেন। তার উপর যাকাত ফরজ হবে হজ ওয়াজিব হবে। সকল ইসলামি বিধান কার্যকর হবে।

এটা থেকে বুঝা যায় যদি মানুষ বিট কয়েন বা ক্রিপ্টকারেন্সি সিস্টেমকে তাদের কারেন্সি হিসাবে গ্রহণ করে নেয় এবং তার জটিলতা দূর করা হয় তবে সেটে হালাল হবে।

একই সাথে এর উপর যাকাত ও হজ ফরজ হবে এবং সেটা ঠিকঠাক মতো আদায় করতে হবে।

কেননা যদিও ইসলামে স্বর্গ বা রৌপ্য মু্দ্রাকে মূল মুদ্রা হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে কিন্তু মূল মুদ্রা কারো হাতে গচ্ছিত রেখে তার ডকুমেন্ট দ্বারা লেনদেন করার বৈধতা রয়েছে।

যেমনটা টাকা যদিও মূল মুদ্রা নয় কিন্তু তা মূল মুদ্রার ডকুমেন্ট। যেটা দ্বারা লেনদেন সব কিছু করা হালাল।

Leave a Comment