ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল – আউটসোর্সিং জায়েজ কি না

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল – এই প্রশ্নটি বর্তমানে বেশ আলোচিত। কেননা আমাদের দেশে দিনেদিনে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং শব্দ দুটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছে ।

উইকিপিডিয়া বাংলার তথ্যমতে ফিল হাল বাংলাদেশের ছয় লক্ষ তরুণ তরুণী ফ্রিল্যান্স-মার্কেটপ্লেসে জব করছেন।

তাই স্বাভাবিকভাবে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে – ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? এই জব ইনকাম হালাল না কি হারাম?

আজকের ব্লগে আমারা ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল – বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি। কোরআন সুন্নাহ থেকে রেফারেন্সসহ আউটসোর্সিং নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্ঠা করবো। ইন শা আল্লাহ!

ব্লগটিতে থাকছে –

আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং কী

ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল ? আউটসোর্সিং জায়েজ কি না ? এই উত্তরটি জানতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিং জিনিসটা আসলে কী।

ফ্রিল্যান্সিং কী – ফ্রিল্যান্সিংকে বলা হয় – মুক্ত পেশা। কেননা এখানে একজন ফ্রিল্যান্সার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধিনস্ত থাকে না।

সে – যে কোনো ফ্রিল্যান্স-মার্কেটপ্লেসে, যে কোনো সময়, তার সার্ভিসকে সেল করার সুযোগ পেয়ে থাকে।

চাই তার বায়ার দেশের হোক বা বিদেশের। একজন হোক বা একাধিক।

এভাবে প্রতিদিন তার জন্য কাজ করাও আবশ্যিক নয়। সাপ্তায় যে দিন ইচ্ছা সে দিন কাজ করতে পারে।

আবার যে দিন মন চায় সে দিন কাজ বন্ধও রাখতে পারে। তাই এই কাজটিকে বলা হয় ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশা।

আউটসোর্সিং কী – অপাশ থেকে যে কাজ করিয়ে নিচ্ছে, সে নিজের কোম্পানি বা অধিনস্ত স্টাফের আউট একজনকে দিয়ে কাজটি করাচ্ছে।

তাই তার দিক থেকে এই কাজকে আউটসোর্সিং বলা হয়। অর্থাৎ একই কাজ দুজন ব্যক্তির দুটি দিক বিবেচনা করে দুটি নামে ডাকা হচ্ছে।

মূলত ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে ইনকাম করার মাধ্যম। আর আউটসোর্সং হচ্ছে কাজ করিয়ে নেওয়ার মাধ্যম।

তবে অনেক সময় আউটসোর্সং শব্দটি দ্বারা ফ্রিল্যান্সিং উদ্দেশ্য নেওয়া হয়ে থাকে।

কিন্তু আউটসোর্সিং সেক্টরে কাজ, কাজের পেমেন্ট পাওয়ার নিশ্চিয়তা ইত্যাদি বিষয় কেন্দ্র করে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

যার উপর মূলত ফ্রিল্যান্সিং হালাল বা হারাম হওয়া নির্ভর করে। আমরা নিন্মে বিস্তারিত আলোচনা করছি।

আউটসোর্সিং সেক্টরে কী কী কাজ পাওয়া যায়

ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে ক্যাটগরি ও সাব-ক্যাটাগরিতে বিভক্ত অসংখ্য জব থাকে। যা থেকে বায়ার তার নিজের নির্দিষ্ট কাজটি যে কোনো ফ্রিল্যান্সারকে দিয়ে করিয়ে নেয়।

এ সব কাজের মধ্যে ইসলাম মৌলিকভাবে হারাম করেছে এমন কোনো ক্যাটাগরি বা সাব-ক্যাটাগরি আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।

আউটসোর্সিং  - ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল
ফাইভার মার্কেটপ্লেসের জব ক্যাটগরি ও পলিসি

এই কাজগুলো যেহেতু মৌলিকভাবে হারাম নয়, তাই তা করে দিয়ে ইনকাম করতে ইসলাম নিষেধ করে না। বরং নিজের শ্রম দিয়ে ইনকাম করাকে ইসলাম প্রশংসার চোখে দেখে।

ফ্রিল্যান্সিং – কাজ গ্রহণ ও জমা দেওয়ার সিস্টেম

আউটসোর্সং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য ফ্রিল্যান্স-মার্কেটপ্লেসই জব পাওয়া ও জমা দেওয়ার মূল মাধ্যম।

এই মার্কেটপ্লেসগুলো মূলত সেলার ও বায়ারের মধ্যখানে কমিউকেশন তৈরি এবং কাজ ও পেমেন্ট আদান প্রদানে মধ্যস্ততা করে থাকে।

যদিও মার্কেটপ্লেসের বাহির থেকেও অনেক সময় কাজ পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে সেলার ও বায়ার বিশ্বাস নির্ভর হয়ে কাজ করে থাকেন।

যেহেতু তারা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস অর্জন হওয়ার পর কাজ দেন বা করেন। তাই সেখানেও পারিশ্রমিক লস যাওয়ার প্রসিবিলিটি খুব একটা নেই।

মার্কেটপ্লেসগুলোর পলিসি ও কন্ডিশন খুব স্মার্ট হয়ে থাকে বলে সেলার বা বায়ার কেউই কাউকে সহজে ঠকাতে পারে না।

মার্কেটপ্লেসগুলোর প্রাইভেসি পলিসি কেমন হয় বুঝতে চাইলে ফাইভারআপওয়ার্ক থেকে তাদের পলিসি দেখে আসতে পারেন।

ইসলামি ব্যবসা সংক্রান্ত আইনে এমন সব পন্থাকে নিষেধ করা হয় যেখানে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্য ঝগড়া তৈরি হওয়া বা কোনো পক্ষের লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে ফ্রিল্যান্স-মার্কেটপ্লেসগুলোর মধ্যস্ততায় সেই সম্ভাবনা থাকে না। তাই ইসলামি আইন মোতাবিক ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং বৈধ হওয়ার পথে কোনো বাধা নেই।

আউটসোর্সিং – পেমেন্ট প্রদান ও গ্রহণ

ইসলামি ব্যবসা সংক্রান্ত আইনে আরেকটি মৌলিক বিষয় হলো পণ্য ও তার মূল্য সুনির্দিষ্ট থাকা।

ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে পণ্য হয়ে থাকে ফ্রিল্যান্সারের কাজ, যা নিয়ে পূর্বে আলোচনা হয়েছে। আর মূল্য হয়ে থাকে কাজের পারিশ্রমিক।

মার্কেটপ্লেসে কাজের শুরুতে সেলার ও বায়ার কাজের কন্ডিশন ও রেট ডিটেলস আলোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে নেন। বিধায় এই দিক থেকেও কাজটি অবৈধ বলার কোনো উৎস নেই।

বাকি থাকে পেমেন্ট প্রদান ও গ্রহণ সিস্টেম। মার্কেটপ্লেসে বায়ার সেলার প্রত্যেকের একটি করে একাউন্ট থাকে।

যেখান থেকে সহজে পেমেন্ট আদান প্রদান করা যায়। অতপর সেখান থেকে লোকাল ব্যাংকে ট্রানসফার করা যায়। তাই এখানেও কোনো জটিলতা নেই।

ফ্রিল্যান্সিং হালাল হওয়ার দালায়িল

আল্লাহ তায়ালা বলেন –

‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরে অন্যায় পন্থায় একে অন্যের মাল ভক্ষণ করো না। তবে ব্যবসায়িক পন্থায় সম্মতির ভিত্তিতে ভক্ষণ করতে অসুবিধা নেই।’ ( সুরা নিসা – ২৯ )

রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেন –

নিজের হাতের উপার্জন থেকে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায় নি। আল্লাহর নবি দাউদ -আলাইহিস সালাম- নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন।’ ( সহিহ বুখারি – ২০৭২ )

শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া – রাহিমাহুল্লাহ হলেন –

প্রচলিত নির্দিষ্ট কোনো কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ আছে। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে আমির বললো – ঐ দূর্গের বিনিময়ে ঐ পরিমান পারিশ্রমিক দেবো।’ ( মাজমুউ ফাতাওয়া লি ইবনি তাইমিয়াহ)

উপসংহার – ফ্রিল্যান্সিং হালাল তবে …

স্বার্বিকদিক বিবেচনায় রেখে – আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং কি হালাল? প্রশ্নটির উত্তরে বলা যায – হ্যা তা হালাল।

বরং যদি হালাল উপায়ে ফ্রিল্যান্সিং করার গাইড লাইন মেনে কাজটি করা হয় তাহলে তা প্রশংসনীও বটে।

তবে সর্বক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে অফলাইন কর্মক্ষেত্রে যা কিছু অবৈধ অন-লাইন কর্মক্ষেত্রেও তা অবৈধ।

অফ-লাইনে হালাল পন্থায় ব্যবসা বা চাকুরী করতে হলে যে সব শর্ত মানতে হয় যেমন ধোঁকাবাজি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ইত্যাদি, অন-লাইনেও সে সবকিছু মেনে চলতে হবে।

এমন কোনো কাজ করা যাবে না যা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। যেমন নগ্ন বা অর্ধনগ্ন ইমেইজ বা ক্লীপ দিয়ে ভিডিও তৈরি। নারী দেহ প্রদর্শনমূলক এডভাইজমেন্ট ব্যানার তৈরি।

অশ্লীল ফটোযুক্ত গ্রাফিক্স ডিজাইন। এডল্ট ডেটিং বা পর্ণ সাইট ডেভেলপ। তখন এই বায়ারের কাজটি এক্সেপ্ট করা যাবে না। কেননা এটা ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন –

অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না। প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য।’ ( সুরা আনআম – ১৫১ )

আরো পড়ুন হালাল উপায়ে ফ্রিল্যান্সিং করার একটি পরিপূর্ণ গাইড লাইন

লেখক – শাহ মুহাম্মাদ সুহাইল
ব্লগ নাম্বার – ১২

Leave a Comment