দোয়া কুনুত – উচ্চারণ, বাংলা অনুবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাসায়িল

দোয়া কুনুতদোয়া মুমিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। ইবাদত দ্বারা সওয়াব পেতে হলে তা উচ্চারণ হতে হবে নির্ভুল। পন্থা হতে হবে বিশুদ্ধ। নিয়তে থাকতে হবে এখলাস।

তাই আজকের ব্লগে আমরা দোয়া কুনুত – উচ্চারণ অনুবাদ ও তা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছি।

দোয়া কুনুত – শাব্দিক ও অভিধানিক অর্থ বিশ্লেষণ

শাব্দিক অর্থ – কুনুত শব্দটি আভিধানিকভাবে বেশ কয়েকটি অর্থের উপর প্রয়োগ হয়। প্রশিদ্ধ কয়েকটি অর্থ নিচে তুলে ধরছি।

  • অনুগত – যেমন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন –

وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ

অর্থ – অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী।

  • নামাজ – যেমন – রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন –

مَثَلُ المُجَاهِدِ في سَبيلِ اللهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ القَائِمِ القَانِتِ بآيَاتِ اللهِ

অর্থ – আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী ব্যক্তির উপমা হলো আল্লাহর আয়াত নিয়ে নামাজে দণ্ডয়মান রোজাদার ব্যক্তির মতো।

  • নীরবতা – যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন –

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ

অর্থ – নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যম নামাজ। আর আল্লাহর সামনে নীরবে দাঁড়াও।

  • দাঁড়ানো – যেমন রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে কোন নামাজ উত্তম জানতে চেয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন –

طُولُ القُنُوتِ

অর্থ – যে নামাজ লম্বা সময় দাঁড়িয়ে পড়া হয়।

পরিভাষায় কুনুত হলো – নির্দিষ্ট নামাজের শেষ রাকাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে একটি বিশেষ দোয়ার নাম।

দোয়া কুনুত – উচ্চারণ ও বাংলা অনুবাদ

সাহাবায়ে কেরাম থেকে দোয়া কুনুত হিসাবে কয়েকটি দোয়া বর্ণিত রয়েছে। যার মধ্য থেকে দুটি দোয়া বেশ প্রশিদ্ধ।

তার একটির উপর হানাফি মাযহাব অনুসারীরা আমল করেন। আর অন্যটির উপর আমল করেন শাফিয়ি মাযহাব অনুসারীরা।

হানাফি মাযহাবে দোয়া কুনুত উচ্চারণ ও অনুবাদ

দোয়া কুনুত
দোয়া কুনুত

উচ্চারণ – আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা। ওয়া নাসতাগফিরুকা। ওয়া নু’মিনু বিকা। ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা।

ওয়া নুসনি আলাইকাল খাইর। ওয়া নাশকুরুকা। ওয়া লা নাকফুরুকা। ওয়া নাখলা-উ। ওয়া নাতরুকু। মাই ইয়াফজুরুকা।

আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না’বুদু। ওয়া লাকা নুস্সালি। ওয়া নাসজুদু। ওয়া ইলাইকা নাসয়া। ওয়া নাহফিদু। ওয়া নারজু রাহমাতাকা। ওয়া নাখশা আযাবাকা। ইন্না আযাবাকা বিল কুফ্ফারি মুলহিক।

অনুবাদ – ইয়া আল্লাহ, আমরা কেবল তোমার সাহায্য কামনা করি। তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। তোমার উপর বিশ্বাস ও উপর ভরসা রাখি।

সকল ভালো কাজে তোমার প্রশংসা করি। তোমার শোকর আদায় করি। তোমাকে অস্বীকার করি না। যে তোমার অবাধ্য হয়, তাকে পরিহার করে চলি।

ইয়া আল্লাহ, আমরা কেবল তোমার উপাসনা করি। তোমার জন্য নামাজ পড়ি, সিজদা দেই। তোমার পথে সচেষ্ট থাকি, এগিয়ে চলি।

তোমার রহমত কামনা করি। তোমার শাস্তি ভয় করি। তোমার শাস্তি তো কেবল অবিশ্বাসীদের জন্য র্নিধারিত

শাফিয়ি মাযহাবে দোয়া কুনুত – উচ্চারণ ও অনুবাদ

দোয়া কুনুত
দোয়া কুনুত

উচ্চারণ – আল্লাহুম্মাহদিনা ফিমান হাদাইতা। ওয়া আফিনা ফিমান আফাইতা। ওয়া তাওয়াল্লানা ফিমান তাওয়াল্লাইতা। ওয়া বারিক লানা ফিমা আতাইতা। ওয়াকিনা শাররি – মা কাযাইদা।

ইন্নাকা তাকযি ওয়া লা ইউকযা লাইকা। ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মান ওয়ালাইতা।ওয়ালা ইয়াইয্যু মান আদাইতা। তাবারাকতা রাব্বানা ওয়া তায়ালাইতা।

অনুবাদ – ইয়া আল্লাহ, যাদের তুমি সৎ পথে পরিচালনা করেছো তাদের সাথে আমাকে সৎ পথে পরিচালনা করো। যাদের তুমি সুখ-স্বস্তি দিয়েছো তাদের সাথে আমাকে সুখ-স্বস্তি দান করো।

যাদের অভিভাবকত্ব তুমি গ্রহণ করেছো, তাদের সাথে আমার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে নাও। আমাদের যা দান করেছো তার মধ্যে বরকত দান করো। আমাদের সেই অনিষ্ট থেকে রক্ষা করো যা তুমি ফয়সালা করে রেখেছো।

নিশ্চয় আপনি ফয়সালা কার্যকর করেন। আপনার উপর কেউ হুকুমরাজি করতে পারে না। বস্তুত সে ব্যক্তি লাঞ্চিত হয় না, যাকে তুমি আপন করে নিয়েছো।

আর সে ব্যক্তি মান পায় না, যাকে তুমি শত্রু সাব্যস্ত করেছো। হে আমাদের প্রতিপালক – আপনি বরকতময়। আপনি সুমহান।

বিতির নামাজে কুনুত পড়ার হুকুম ও স্থান

বিতির নামাজে দোয়া কুনুত পড়তে হবে কি না? পড়লে কখন পড়তে হবে? রুকুর আগে নাকি পরে? এ নিয়ে ইমামদের মধ্য মতবিরোধ রয়েছে। নিচে তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

হানাফি মাযহাবে দোয়া কুনুত পড়ার হুকুম ও স্থান

ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ’র মতে দোয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুমাল্লাহ’র মতে সুন্নত।

তবে তাদের তিন জনই সারা বছর রুকুর আগে দোয়া কুনুত পড়তে হবে মর্মে ঐক্যমত পোষণ করেছেন।

তাদের মতে বিতির নামাজে মুসল্লি তৃতীয় রাকাতে কিরাত পাঠ করার পর তাকবির উচ্চারণ করে হাত তুলে দোয়া কুনুত পড়বে।

তারা কা’ব রাদি. থেকে বর্ণিত নিম্নের হাদিসটি দ্বারা রুকুর আগে দোয়া কুনুত পড়ার উপর দলিল পেশ করেন।

`রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – রুকুর আগে দোয়া কুনুত পড়তেন।’

কিন্তু দোয়া কুনুত পাঠ করার সময় তাকবির বলে হাত তুলার উপর হানাফি মাযহাবে কোনো দলিল পেশ করা হয়নি। তাই অনেকে এরকম হাত তুলাকে দলিলহীন সাব্যস্ত করেছেন।

যদি কেউ দোয়া কুনুত না পড়ে রুকু করে নেয়, তাহলে রুকু থেকে দাঁড়ানোর পর আর কুনুত পড়বে না। তার উপর থেকে কুনুত মওকুফ হয়ে যাবে। তবে তাকে সিজদা সাহু করতে হবে।

মালিকি শাফিয়ি ও হাম্বলি মাযহাব

মালিকি মাযহাব – মালিকি মাযহাব মতে বিতির নামাজে দোয়া কুনুত পড়া জায়েজ নয়। চাই বছরের যে কোনো দিনই হোক না কেন।

তাউস – রাহিমাহুল্লাহ – বলেন বিতির নামাজে কুনুত পড়া বিদআত। ইবনে উমার – রাদিয়াল্লাহু আনহু – কখনোই কুনুত পড়তেন না মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায়।

তবে মালিকি মাযহাবের প্রশিদ্ধ মত হলো বিতির নামাজে কুনুত পড়া মাকরুহ। ইমাম মালিক রামজান মাসে শেষভাগে কুনত পড়তেন বলে আরেকটি অভিমত রয়েছে।

শাফিয়ি মাযহাব – শাফিয়ি মাযহাব মতে কেবল রামাজান মাসের শেষভাগে দোয়া কুনুত পড়া মুস্তাহাব। এক রাকাত দ্বারা বিতির আদায় করলে এই রাকাতে কুনুত পড়বে।

একের অধিক রাকাত দ্বারা বিতির করলে শেষ রাকাতে কুনুত পড়বে। তবে শাফি মাযহাব মতে রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর দোয়া কুনুত পড়তে হবে।

হাম্বলি মাযহাব – হাম্বলি মাযহাব মতে সারা বছরই এক রাকাত বিশিষ্ট বিতিরের শেষে কুনুত পড়া সুন্নত।

আবু হুরাইরা – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বর্ণনা করেন –

`রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – রুকুর পড়ে কুনুত পড়তেন।’

তবে কেউ যদি কিরাতের পর তাকবির দিয়ে হাত তুলে রুকুর আগেই কুনুত পড়ে নেয় তাহলেও জায়েজ হবে।

কেননা কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন –

`রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বিতির নামাজে রুকুর আগে কুনুত পড়তেন।’

Leave a Comment