জ্ঞানের গল্প – অজানা অন্ধকার ও শুভ্র দীপাবলি

জ্ঞানের গল্প – অজানা অন্ধকার ও শুভ্র দীপাবলি

পৃথিবীপারে আমরা যে জীবন পার করছি; সেই জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত – আরো বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত একটি জীবন।

এই জীবন যদি কবিতার মতো হতো, তবে তার দিনগুলো চিত্রকল্প ও ছন্দ রসের মতো বিস্মিয়ভরা রঙরূপ আর রম্যরসে কেটে যেতো।

কিম্বা শিল্পের মতো হলেও জীবনের যবনিকা চারুকলার মতো পরিপাটি হয়ে আসতো।

কিন্তু জীবন জীবনই। কবিতা বা শিল্প নয়। জীবনে যা ঘটে শিল্পে এবং কবিতায় তা ঘটে না। তাই জীবনের সঙ্গে অন্য কোন কিছুর তুলনা চলে না।

সমস্ত সৌন্দর্য, সমস্ত প্রতিজ্ঞা, সমস্ত স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের ওপারে জীবনের লীলাখেলা।

জীবনের পথে পথে থাকে শ্রাবণের ঐশ্বর্যভরা রাত। পৌষের রূপোলী আলো বিস্তৃত খড়ের মাঠ। ঝলমলে তারকার ভারে নুয়ে পড়া আকাশ।

থাকে অবাধ যৌবন। সুকান্ত ললনা। প্রেমময় প্রাসাদ। মুঠোভরা অর্থ ও আরো অনেক কিছুর নেশা।

তাই জীবন থেকে যায় জীবনের মতো। জীবনের সাথে উপমা মিলে না কোন কিছুর।

জীবনে থাকে সাইক্লোন ট্রনেডো ফণির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত বালা-মুসিবত।

থাকে সমস্ত তেজস্ক্রিয়তাসহ মাটির গভীরে দেবে যাওয়া বোমার মতো বুকের গভীরে আত্মগোপন করা কষ্টের জঞ্জাল। অশান্ত অস্থির বহু নির্ঘুম রজনী।

এতোসব বাধা বিপত্তি ঝড় ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে চলতে হয় জীবনের পথ। অটল থাকতে হয় সিরাতে মুস্তাকিমের উপর।

মোকাবেলা করতে হয় সামন পেছন ডান বাম সর্বদিক থেকে বনি আদমকে বিপথগামী করার শয়তানের সেই চ্যালেঞ্জ। অতপর উপভোগ করতে হয় জীবনের স্বাদ।

এমন একটি বিপদসংকুল কাঁটা কঙ্কর পুঁতিত পথে যদি কোন অকৃত্রিম বন্ধু পাশে না থাকে, আলো না দেখায়,

তাহলে পথিক যে হোঁচট খাবে, পথহারা হবে, তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়।

আমি এরকম কিছু বই, কিছু অকৃত্রিম বন্ধুর সাথে পথ চলছি বিগত কয়েক বছর থেকে।

জ্ঞানের গল্প – অজানা অন্ধকার ও শুভ্র দীপাবলি, প্রথম বই

ড. মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান আল আরিফী রচিত ‘ইসতামতা’আ বি হায়াতিকা’ বইটি অনন্য একটি বই।

এই বইটি আমার হাতে পাওয়ার দিন তারিখ ঠিক বলতে পারবো না। কিন্তু পড়া শুরু করারপর আমি কি রকম শিহরিত হয়েছিলাম তা একটি বিস্ময় বলাই যুৎসই হবে।

জীবনের সকল পরিস্থিতিতে নেমে আসা ঘটনা প্রবাহকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখার সুসংহত এক দর্শন গচ্ছিত রাখা হয়েছে বইটির পাতায় পাতায়।

রাসুল (সা.) কতো সুক্ষ্ম নন্দিত কর্মদক্ষতার মধ্যদিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করার চাবি হাতে নিয়েছিলেন।

তাঁর চরিত জনমানসে কতো প্রবলভাবে রেখাপাত করছিলো। তাঁর জীবনাদর্শ যে আমাদের জীবনকে মার্জিত ও উপভোগ্য করে তুলার একমাত্র অবলম্বন।

লেখক সে কথাটি খুলেখুলে এমনভাবে বলেছেন জানাশুনা পুরাতন কথা তবুও মনে হয় নতুন সুস্বাদু সুপেয়।

এরকম একটি বই জীবনকে পবিত্র ও প্রাঞ্চল রাখতে যে শক্তির যোগান দেয় লেলিন বা সক্রেটিসের দর্শন সে তুলনায় বিশাল ও গভীর সমুদ্রের মোকাবেলায় বদ্ধদিঘীর মতো নগণ্য ও অসহায় মনে হয়।

অজানা অন্ধকার ও শুভ্র দীপাবলি – দ্বিতীয় বই

আমার পঠিত সেরা বইগুলোর দ্বিতীয় স্থানে রাখছি ড. আইয আল কারনি রচিত ‘লা তাহযান’ বইটি।

এখানে ‘সেরা’ বিশেষণটি পরিক্ষার উত্তরপত্রে মার্ক হিসেব-নিকেশ কষে সেরা নির্ণয় করার মতো এতোটা নিরপেক্ষ নয়।

হুড়মুড় করে অনেকগুলো বই স্মৃতিপটে এসে সেরা হওয়ার দাবিতে মিছিল করতে থাকলে আমি চতুর রাজনীতিবিদের মতো বিষয়টি সমাধান করে ফেলি।

ভিন্ন-ভিন্ন মুখরোচক কথায় ভিন্ন-ভিন্ন বইকে শান্তনা দিতে থাকি। অতপর দরাজকণ্ঠে বলে দেই –

আমি এমন তিনটি বই নিয়ে লিখবো যা – জীবন ও সমাজের ঘাতপ্রতিঘাত মোকাবেলা করে প্রাঞ্চল হয়ে বেঁচে থাকতে শক্তি যোগায়, তাই বাকিরা বিদেয় হতে পারো।

‘লা তাহযান’ বইটির আমার হাতে কপিতে সাতাইশতম সংস্করণ এবং দুই মিলিয়ন কপি ছাপানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া বইটি বাংলা ইরেজিসহ বিশ্বের কতো ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তা ঠিকটাক বলতে না পরলেও পঞ্চাশের কম হবে না বলে আমার বিশ্বাস।

এই বইটি আমি বেশ কয়েকবার আগামুণ্ড পড়েছি। যখনই মনের উঠোন হতাশা বা গ্লাণিতে ছেয়ে যায় তখন এই বইটি হাতে নেই।

মনে হয় সংসারের সমস্ত হতাশা, সমস্ত জঞ্জাল টুকরো টুকরো হয়ে কেটে পড়ছে।

আসমানী বাণীর সুধা থেকে হাদিসের হীরক থেকে কবিতার শিল্প থেকে নিসর্গের ভাণ্ডার থেকে শান্তনা এসে জমতে থাকে বুকের তলে।

এরকম একটি বইয়ের সাথে থাকা মানে হচ্ছে সালাফে সালিহিনের সাথে থাকা। তাদের মুখে গল্প শুনা। তাদের থেকে পাথেয় নেওয়া।

মনে হয় হতাশার সর্বগ্রাসী আঁধারে আলোর মশাল হাতে তাঁরা এগিয়ে আসছেন।

তখন মেঘহীন আকাশের মতো আমার মনে ধবধব করতে লাগে শুভ্র সুন্দর দ্যুতি।

আমি হয়ে ওঠি তাজা ফুলের মতো সতেজ ও শক্ত।

জ্ঞানের গল্প – অজানা অন্ধকার ও শুভ্র দীপাবলি

কুতুবখানায় ঢুকলে আমার মনে একটি আনন্দ ঢেউ দিয়ে জেগে ওঠে। নতুন পুরাতন কিতাবাদি থেকে ছুটে আসা গন্ধ আমাকে নেশার মতো আকর্ষণ করে।

আমি প্রতিটি কিতাবের লেখকের সান্নিধ্য অনুভব করার চেষ্টা করি। যিনি নরম কোন রাতের নির্জনে দোয়াত কালি নিয়ে বসেছিলেন।

লেখালেখির ভেতর মনোযোগ ঢেলে দিয়ে সারারাত কাবার করে দিয়েছিলেন। এতো বিশাল বিশাল খণ্ডের কিতাব তাঁরা কীভাবে লিখে গেলেন সে কথাও চিন্তা করি।

গতমাসে আমাদের কুতুবখানায় নতুন কিছু কিতাব আনা হয়। সেই কিতাবগুলো দেখে আমি ঠিক কতোটা আনন্দিত হয়েছিলাম বই-কিতাবের জন্য আমার মতো তৃষাতুর কোনপ্রাণ না হলে তা বুঝা অসম্ভব।

তখন আমি প্রতিটি কিতাব নাড়াচাড়া করে দেখতে থাকি। একপর্যায়ে সিরাত বিষয়ে রচিত ইমাম ইবনুল কায়্যিম -রাহিমাহুল্লাহ-‘র ‘যাদুল মায়াদ ফি হাদয়ি খায়রিল বাশার’ কিতাবটি আমার হাতে আসে।

যাদুল মায়াদ ফি হাদয়ি খায়রিল বাশার

কিতাবটির নাম ডাক সম্পর্কে আমি আগে থেকেই অবগত ছিলাম। তাই হাতে পেয়েই পড়তে শুরু করে দিলাম।

পড়তে পড়তে আমি ভেতরে ঢুকতে থাকলে আমার মনে হতে লাগে আমি যেন প্রাচীন আরবের কোনো এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছি।

আর সেখান থেকে সবকিছু স্বচক্ষে দেখছি। আমি এর আগেও সিরাত পড়েছি। কিন্তু আত্মতৃপ্তি পাইনি।

কারণ সেই গ্রন্থগুলোর বর্ণনার উপর আমার কিছুটা হলেও অনাস্থা থাকতো। কিন্তু এই কিতাবটি ব্যতিক্রম। সহিস হাদিস দিয়ে সবকিছু প্রমানিত।

এ জন্য কিতাবটিকে সিরাতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একটি কিতাব হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

সিরাতরাতের বিন্দু থেকে সিন্ধু পর্যন্ত সবকিছুই হৃদয়ে নাড়া দেওয়ার মতো হলেও একসাথে সবকিছু ধারণ করার ক্ষমতা হয়তো আমার নেই।

তাই এক সময় এক বিষয় অন্য সময় অন্য বিষয় আমার মনে নাড়া দেয়।

সেদিন যে বিষয়টি আমার মনে রেখাপাত করেছিলো তা হলো – পারিবারিক জীবনে দীন-দশায় তাঁর নিঃসংকোচতা।

আমার চোখে ভাসে রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- নিজ হুজরায় যাচ্ছেন। অতপর তাঁর স্ত্রীর কাছে খাবার চাচ্ছেন।

কিন্তু স্ত্রী জানালেন ঘরে কোনো খাবার নেই। তিনি ঘোষণা দিলেন তাহলে আমি রোজা রেখে নিলাম।

এই বিষয়টি আমার মনে প্রবলভালে নাড়া দিয়ে ওঠে। তখন আমি ভাবতে লাগি রাসুলচরিত থেকে আমরা যদি কেবল এই অংশটাই গ্রহণ করতাম।

খাবারের অর্থের সমস্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে আমরা যোগান না পেলে যদি এ রকম ধৈর্যশীল হতে পারতাম।

তাহলে হয়তো জীবনে হতাশা হাহাকার বা সুখহীনতা বলে কিছু থাকতো না।

জীবন হয়ে যেতো সুখ সৌরভের অন্যন্য উপমা। চার খণ্ডের এই কিতাবটিতে রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -‘র জীবন চরিত এতো সুণিপুণ ও বিশুদ্ধভাবে অঙ্কিত করা হয়েছে –

নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় এটা সৃষ্টির আদি-অন্ত বিস্তৃত সমস্ত জীবন চরিতের শ্রেষ্ঠ একটি চিরত।

মানুষের জীবন ও ভেতরকে যদি একটি অজানা অন্ধকারের স্রোত বলা যায়, তাহলে এই তিনটি বই হবে সেই স্রোতেরধারে শুভ্র দীপাবলি।

লেখক – শাহ মুহাম্মাদ সুহাইল

Leave a Comment