ছবি তোলা কী হারাম?

Is taking picture haram? প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার পূর্বে ছোট একটি গল্প শেয়ার করে নেই।
১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সালের কথা। আমি তখন ছিলাম বয়সে অনেক ছোট। সে সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধ চলছিলো।
আমেরিকা ও সৌদিআরব যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠায়নি কিন্তু ভেতরগত দিক থেকে আফগান সৈন্যদের সবরকম সহযোগিতা করে যাচ্ছিলো।
আফগান ও রাশিয়া যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ১৯৯৯ সালের দিকে। আফগানরা বিজয় লাভ করে। সেই যুদ্ধে একটি গৌরবময় ভূমিকা রাখেন উসামা বিন লাদেন।
মুসলিম এই মহান শহীদের জন্ম হয়েছিলো সৌদি আরবে। প্রথম দিকে তিনি সৌদি রাজ পরিবারের বিশ্বস্ত একজন ব্যক্তি ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি সৌদি রাজ পরিবারের নানান অনিয়ম নিয়ে কথা বলা শুরু করলে তাকে সৌদি থেকে বহিষ্কার করা হয়। অতপর তিনি আফগান যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাস্তার পাশে টানানো ব্যানারে বা ছাপা হওয়া পত্র পত্রিকায় উসামা বিন লাদেনকে পিকচার ছাপা হতো একজন সম্ভ্রান্ত বীর হিসাবে।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তালেবানরা আফগানিস্তানের শাসনক্ষমতায় আসে। কিন্তু নানান কারণে তালেবান সরকারের সাথে আমেরিকার টানাপোড়ন শুরু হয়।
অবশেষে আমেরিকা তালেবান সরকারের উপর হামলা করে বসে। শুরু হয় তালেবান ও আমেরিকার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে বিন লাদেন তালেবানের পক্ষ নেন।
এরপর থেকে উসামা বিন লাদেনকে বিশ্বের সামনে একজন জঙ্গি হিসাবে উপস্থাপন করা হতে থাকে। তার পিকচার ছাপানো হতে থাকে বিকৃত করে।
দীর্ঘ ২০ বছর যাবত চলমান যুদ্ধের এক পর্যায়ে বিন লাদেন শহীদ হয়ে যান। তিনি শহীদ হওয়ার সময় তার ছবিগুলো ইলেট্রিক মিডিয়ায় প্রচার হতে থাকে।
বিন লাদেন সাথে আমার পরিচয় যদিও হয়েছিলো ছাপা হওয়া পিকচার দেখে কিন্তু তার বিদায়ের সময় আমি কেবল ইলেট্রিস ডিভাইসে তার পিকচার দেখেছিলাম।
এই কয়েটি বছরে পৃথিবীময় ব্যাপক পরিবর্ত আসে। কোটি কোটি মানুষ ইলেট্রিক ডিভাইস ব্যবহার শুরু করে দেয়। প্রতি দিন অগণিত পিকচার কারা তুলছে।
কিন্তু ইসলামে পিকচার তুলার বিধান কী? মোবাইল বা কম্পিউটারে পিকচার গ্রহণ করা কী ইসলাম সমর্থিত? এই উত্তরটি নিচে আলোচনা করছি।
Is taking picture haram?
ইলেকট্রিক ডিভাইসে পিকচার গ্রহণ হারাম নয়। যেমন মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। তবে সেটা যদি কোনো কাগজে ছাপা বা প্রিন্ট করা হয় তাহলে হারাম হবে।
আধুনিককালের অনেক ফিকাহবিদগণ হাতে অঙ্কিত সর্বপ্রকার প্রাণীর ছবি হারাম বলে অভিমত দিয়েছেন কিন্তু ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি বৈধ বলে মত দিয়েছেন।
যারা ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি হালাল বলেছেন তাদের মধ্যে শায়খ সালেহ আল উসাইমিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন তিনি বলেন,
‘হাতে আঁকা হলে সেটা নিঃসন্দেহে হারাম ও কবিরা গোনাহ হবে। … ক্যামেরায় গৃহীত ছবি হারাম হওয়ার মতটি অধিক নিরাপদ। আর তা বৈধ হওয়ার মতটি একটু নিম্নস্তরের।
আর বৈধ হওয়ার বিষয়টি কোনো হারাম জিনিস যুক্ত না হওয়ার শর্তের সাথে সংযুক্ত।’ (মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, বিন উসাইমিন – ২/২৬৩)
Taking picture haram হওয়ার দলিল
‘ক্যামেরার মাধ্যমে গৃহীত ছবি আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য রাখে না। সেটা তো আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিকেই তার হুবহু গুণাগুনসহ তুলে ধরে। এর উপমা হলো ফটোগ্রাফের মাধ্যমে টাকার নোটের ছবি গ্রহণ করা।
কেননা টাকার নোটের ছবি তোলার পর যদি সেটা তুমি প্রিন্ট করো তাহলে তা তোমার নিজের বানানো নোট বলা যাবে না ।
বরং সেটা তৈরিকৃত একটি নোটকে যান্ত্রিক মাধ্যম অবলম্বন করার দ্বারা কাগজের উপর প্রকাশ মাত্র।
সুতরাং ক্যামেরার দ্বারা ধারণকৃত মুখ বা শরীরের ছবি বা চোখ নাক ঠোট বুক পা ইত্যাদির ছবি তোমার ছবি গ্রহণ বা কর্মের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে না।
বরং একটি যান্ত্রিক মাধ্যম আল্লাহ তায়ালার সৃজন ও সৃষ্টিকে কেবল নকল করছে।’ (মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল, বিন উসাইমিন-২/২৬৫)
ফেসবুকে ছবি আপলোড কী হারাম?
কোনো প্রাণীর ছবি ডিজিটাল ক্যামেরায় গ্রহণ করার পর তা মোবাইল লেপটপ টেলিভিশন বা ওয়েব পেইজ যেমন ফেসবুক ইউটিউব টুইটার ইত্যাদিতে দেখানো হয় তাহলে তা জায়েয রয়েছে বলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিকাহবিদ মতামত দিয়েছেন।
যদিও কেউ কেউ সেটা জায়েয নয় বলেছেন। কিন্তু দালিলিকভাবে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য অভিমত হলো – ডিজিটাল ক্যামেরার মাধ্যমে গৃহীত ছবি মাল্টিমিডিয়া ও ওয়েব পেইজে প্রদশর্ন জায়েয।
যেমন শায়খ সালেহ আল উসাইমিন বলেন –
‘নব আবিষ্কৃত পন্থায় গৃহীত ছবি দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হলো – তার দৃশ্য ও প্রকাশস্থান স্থিত হবে না।
যেমনটা আমাকে ভিডিও সম্পর্কে অবিহিত করা হয়েছে। তাই তার হুকুম ঢালাওভাবে দেওয়া যাবে না এবং সার্বিকভাবে হারামও হবে না।
এ জন্যই যেসব আলেম প্রিন্টেড ফটোগ্রাফি না জায়েয বলে মত দিয়েছেন তারাও বলেছেন এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (ফাতাওয়া শায়খ সালেহ আল মুনাজ্জিদ -১/৩)
উল্লেখ্যঃ উপ-মহাদেশের কিছু আলেম এই প্রকার ছবি না-জায়েয হওয়ার পক্ষে মত দিলেও শায়খ তাকি উসমানি -হাফিজাহুল্লাহ- সহ অনেক আলেম এটাকে জায়েয বলেছেন।
ফেসবুকে পিকচার আপলোড হালাল
শরিয়ত সেই ছবি-প্রতিকৃতিকে নিষিদ্ধ করেছে যার শরীর রয়েছে বা যা হাত দ্বারা অঙ্কন করা হয়। সেই ছবি একটা স্থানে স্থির থাকে।
কিন্তু মাল্টিমিডিয়া ও ওয়েব পেইজে দৃশ্যমান ছবি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে স্থির থাকে না। সেটা লোকাল ডিক্স বা হোসটিং সার্ভারে সুক্ষভাবে রক্ষিত থাকে।
সেখান থেকে ডাটা কলিংয়ের মাধ্যমে পর্দায় প্রর্দশিত হয়। তাই এই প্রকার ছবি নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না।

Leave a Comment