ইসলামে বাসর রাত – একটি আদর্শ বাসর রাতের প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে?

ইসলামে বাসর রাত – বাসর রাত একটি স্বপ্ন। কল্লোলিত ফুলের মতো সেই স্বপ্নটি দুল খেতে থাকে বিবাবপূর্ব সময়ের পরতে পরতে।

বাসর রাত একটি সজীব দিগন্ত। রকমফের কল্পনা জল্পনা স্নিগ্ধ প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায় সেই দিগন্ত জুড়ে।

বাসর রাত সুপ্রীত ও কাঙ্ক্ষিত। লালিত ও সুরভিত। প্রেমোচ্ছল ও মধু মণ্ডিত।

কিন্তু বাসর রাতের এক প্রান্তে স্বপ্নিল দিগন্ত থাকলেও অপর পান্তে থাকে সংকোচ দ্বিধা ও কিছুটা ভয়ের আনাগুনা।

কেননা বিবাহের মাধ্যমে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে যে বন্ধন তৈরি হয় তার পূর্ণতা আনে বাসর রাত।

তখন থেকেই দুজনের যাত্রা শুরু হয় অনন্তের দিকে – জীবনের শ্যামল বসন্ত থেকে বার্ধক্যের অনুষ্ণ দিনকাল; কবর হাশর ও জান্নাতের পরম পথে।

এ যাত্রা কি সুখময় হবে? না কি বিষাক্ত ক্যাকটাস দুখে বিদুর কর তুলবে পরবর্তী দিনগুলো? এ পথে চলতে কতোটা ত্যাগী ও ধৈর্যশীল হতে হবে? সেই উত্তরটি তখন অজানা থাকে।

ফলে সঞ্চার হয় মৃদু ভয়ের। বুকের কোণে কুণ্ডলিত হতে থাকে ধোঁয়াশার বালিয়াড়ি।

তবে আশার কথা হলো ইসলাম বাসর রাত সম্পর্কে এমন কিছু নির্দেশনা পরিবেশন করে – যা মুসলিম নব-দম্পতিকে সমস্ত ভয় ও সংকোচ থেকে মুক্তি দিতে বদ্ধপরিকর।

তা একটি আদর্শ ও মধুময় বাসর রাতের দ্বার খুলতে অদ্বিতীয়। আমরা ইসলামে বাসর রাত নিয়ে আজকের ব্লগটি তৈরি করছি।

আশা করি সকলের উপকার বয়ে নিয় আসবে। ইন শা আল্লাহ।

ব্লগটিতে থাকছে

ইসলামে বাসর রাত – একটি আদর্শ বাসর রাতের প্রস্তুতি

প্রত্যেক মানুষই মনের মধ্যে বাসর রাত নিয়ে কিছু স্বপ্ন কিছু প্রত্যাশা লালন করে রাখে।

বিবাহের প্রথম রাতে স্বামী স্ত্রী একাকি এক ঘরে মিলিত হওয়ার মধ্যদিয়ে সেই স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হতে লাগে।

তাই সেই রাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা একটি জরুরী বিষয়। বাসর রাতের প্রস্তুতি হিসাবে নিচের কাজগুলো করা যেতে পারে।

এক – নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন

‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।’ ( সহিহ মুসলিম – ২২৩)

দুই – শরীরের অপ্রয়োজনীয় উপাদান যেমন বগল – নাভির নিচের লোম, নখ ইত্যাদি কেটে নেওয়া।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন –

‘পাঁচটি বিষয় মনুষ্য স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। খতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ ও মোচ কাটা।’ (সহিহ বুখারি – ৫৮৮৯)

তিন – ভালো পারফিউম ব্যবহার করা। সুগন্ধির মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ ক্ষমতা। যা আপনার সংঙ্গীকে মানসিকভাবে প্রফুল্ল করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।

আয়িশা – রাদিয়াল্লাহু আনহা – বলেন –

‘আমি রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম। অতপর তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গমন করতেন।’ (সহিহ বুখারি – ২৬৩ )

পাঁচ – নিজের সাধ্যমতো কিছু উপহার কিনে রাখা। যেমন পারফিউম হাত ঘড়ি মোবাইল ফোন বই ইত্যাদি।

স্বামী স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে বা উভয়ে উভয়কে এক বা একাধিক উপহার দিতে পারে। কেননা উপহার মানুষের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি করে।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন

`তোমার একে অন্যকে উপহার দাও, এটা পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি করবে।’

চার – মিষ্টি জাতীয় কিছু খাবার সংগ্রহে রাখা। যাতে উপস্থিত সময়ে স্বামী স্ত্রী একে অপরের মুখে তুলে দিয়ে পারে।

এর ফলে তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসবে। একে অপরের আরো আপন হতে সাহায্য করবে।

সাত – স্বামী স্ত্রী একে অপরের সামনে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন। এই উপস্থাপনটা হতে পারে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকে থেকে।

শারীরিক উপস্থাপন মানে – হলো ভালো পরিধেয় পরে বাসর রাতে হাজির হওয়া।

এক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীর গায়ে কোন ধরণের কাপড় দেখতে পছন্দ করে বা স্ত্রী তার স্বামীর গায়ে কোন ধরণের কাপড় দেখতে পছন্দ করে সেটা স্বামী স্ত্রী উভয়ের জানা থাকলে সে অনুযায়ী কাপড় পরা যেতে পারে।

আর মানসিক উপস্থাপন মানে হলো – মনের মধ্যে সুন্দর অর্থবহ কিছু কথা তৈরা করে রাখা। যাতে তা ভালোবাসা বৃদ্ধি এবং নিজের সুন্দর মন ও অভিরুচি পরিবেশন করতে সাহায্য করে।

আট – এই রাতটি যেহেতু জীবনের গুরুত্ববহ একটি রাত। তাই এই রাতের প্রতিটি কথা ও কাজ সারা জীবন সকল দম্পতি স্মরণ রাখে।

এ জন্য উভয়ে জীবন পরিকল্পনা ঠিক করে নিতে পারেন। স্বামী কী রকম আচরণ স্ত্রী থেকে আশা করেন স্ত্রী কী রকম আচরণ স্বামী থেকে আশা করেন তা শেয়ার করতে পারেন।

বাসর ঘরে প্রবেশ – প্রথম কথা ও কাজ

এক – বাসর ঘরে প্রবেশকালে সালাম দেওয়া। কেননা সালাম অন্তরঙ্গতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি মাধ্যম।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বলেন –

ইসলামে বাসর রাত

অনুবাদ – ‘তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না যতক্ষণ না ইমান আনয়ন করবে। আর পরিপূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে।

আমি কি তোমাদের এমন বিষয়ে অবগত করবো না – যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসতে পারবে? (সেটা হলো) তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার করো।’ ( সহিহ মুসলিম – ৫৪)

দুই – স্বামী স্ত্রী একে অপরের শারীরিক অবস্থা সম্বন্ধে খুঁজ খবর নেওয়া।

তিন – স্ত্রীর রূপ সৌন্দর্য নিয়ে প্রশংসা করা। সকল মানুষই নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে।

আর তা যদি হয় বিশেষ মুহূর্তে তাহলে সেটা আপনার স্ত্রীকে বহুগুণ বেশি প্রভাবিত করবে। তার মন ও শরীরকে প্রফুল্ল করে তুলবে।

চার – স্ত্রীর মাথার অগ্রভাগে হাত রেখে নিচের দোয়াটি পাঠ করা।

ইসলামে বাসর রাত
ইসলামে বাসর রাত

পাঁচ – স্বামী স্ত্রী উভয়ে ওযু করে দু-রাকাত নফল নামাজ আদায় করা।

বাসর রাতের নামাজের নিয়ম – বাসর রাতে নামাজ পড়ার নির্দেশ দানকারী কোনো হাদিসের বর্ণনা – রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – থেকে পাওয়া যায়নি।

তাই বাসর রাতের নামাজকে সুন্নত বলা যাবে না। তবে একাধিক সাহাবা এই নামাজের ব্যপারে উৎসাহিত করেছেন। তাই এটাকে মুস্তাবাহ বলা যেতে পারে।

পদ্ধতি – স্বামী ইমাম হবে আর স্ত্রী তার পেছনে দাঁড়াবে। সুরা ফাতিহার সাথে যে কোনো সুরা মিলিয়ে অন্যান্য নামাজের মতো আদায় করবে।

তেলাওয়াত উচ্চস্বরে বা নিম্মস্বরে যে কোনো ভাবে করা বৈধ। তবে যদি রাতে এই নামাজ পড়া হয় তবে উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করা উত্তম।

যদি স্বামী ইমাম না হয় তবে স্ত্রী একা একাও পড়তে পারবে। অথবা স্ত্রী যদি কোনো কারণে না পড়ে তবে স্বামী একা একা পড়তে পারবে।

ছয় – নামাজ শেষে নিচের দোয়াটি পাঠ করা।

ইসলামে বাসর রাত
ইসলামে বাসর রাত

বাসর রাতে সহবাস ও একটি গাইড লাইন

এক – সহবার শুরুর আগে ফোর প্লে করা। স্ত্রীকে আলিঙ্গন করা। চুমু খাওয়া। শরীরের স্পর্শ কাতর অংশে হাত বুলানো ইত্যাদি।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন –

‘তুমি কেন কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না। এতে সে তোমার সাথে খেলতো আর তুমিও তার সাথে খেলতে।’

হাদিসে খেলা বলে ফোর প্লে উদ্দেশ্য নেওয়ার অবকাশ রয়েছে বলে অনেক মুহাদ্দিস অভিমত দিয়েছেন।

দুই – সহবাসের নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা।

বিশুদ্ধ নিয়ত মানে হলো – সহবাসের শুরুতে সওয়াবের নিয়ত করে নেওয়া। যেমন পাপ পঙ্কিলতা থেকে চরিত্র রক্ষা। নেক সন্তনলাভ ও পরকালীন মুক্তি ইত্যাদি।

একজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – কে প্রশ্ন করলেন –

‘আমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করলেও কি সওয়াব পাবে?

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বললেন,

‘তোমরা কি মনে করো – সে যিনা করলে তার পাপ হতো না? তাহলে হালালভাবে সহবাস করার কারণে সওয়াব পাবে না কেন?’ (সহিহ মুসলিম – ৭২০)

তিনসহবাসের সময় নিম্নের দোয়াটি পাঠ করা

ইসলামে বাসর রাত

উচ্চারণ – বিসমিল্লাহি, আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ্-শাইতানা ওয়া জান্নিবিশ্-শাইতানা মা রাযাকতানা।

অনুবাদ – আল্লাহ তায়ালার নামে শুরু। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের কাছ থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন। এবং আমাদেরকে যে সন্তান আপনি দান করবেন তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন। (সহিহ বুখারি – ১৪১)

চার – এমন কোনো পন্থা বা অবস্থায় সহবাসে লিপ্ত না হওয়া যা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেমন অ্যানাল সেক্স বা স্ত্রী মাসিক চলাকালীন সহবাস ইত্যাদি।

বাসর রাত – সহবাস পরবর্তী করণীয়

এক – গোসল করে নিতে হবে। রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেন – ‘স্বামী যদি স্ত্রীর যৌনির উপর আরোহন করে কর্ম তৎপর হয়ে ওঠে। তাহলে তার উপর গোসল ওয়াজিব হয়ে যাবে। যদিও বীর্য নির্গত না হোক।’ (সহিহ মুসলিম)

দুই – প্রথমবার সহবাস শেষ হওয়ারপর দ্বিতীয়বার সহবাস শুরু করার পূর্বে ওযু করে নেওয়া মুস্তাহাব।

রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেন –

‘তোমাদের কেউ সহবাস করারপর যদি দ্বিতীয়বার সহবাস শুরু করতে চায় তাহলে সে যেন ওযু করে নেয়। এটা তার দ্বিতীয় সহবাসকে স্বাদময় করবে।’ ( সহিহ মুসলিম – ১/১৭১)

তিন – সহবাস শেষেই গোসল না করে বিলম্ব করার অবকাশ আছে। তবে তখন ওযু করে নেওয়া মুস্তাহাব।

উমার -রাদিয়াল্লাহু আনহু- নবি কারিম -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে প্রশ্ন করেছিলেন –

‘আমাদের কেউ সহবাস শেষে অপবিত্র অবস্থায় ঘুমাতে পারবে কি না?’

রাসুলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- বলেন –

‘হ্যাঁ তার জন্য এটার অনুমতি আছে। তবে চাইলে ওযু করে নিবে।’ (সহিহ ইবনু হিব্বান – ২৩২ )

লেখক – শাহ মুহাম্মাদ সুহাইল

1 thought on “ইসলামে বাসর রাত – একটি আদর্শ বাসর রাতের প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে?”

  1. A informative and help full content.
    Thanks A lot.

    Reply

Leave a Comment