ইসলামে খতনা কী? কেন খতনা করা হয়?

ইসলামের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উন্নতম একটি হলো খাতনা। কেবল ইসলাম ধর্মই খাতনাকে ধর্মীয় কর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

খাতনা করার দ্বারা পূণ্যলাভ হয় তার পাশাপাশি ইহকালেও বেশ কিছু উপকার ভোগ করা যায়। তবে সঠিক করা এবং এর দ্বারা পূণ্যলাভের জন্য ইসলামিক নিয়মে খাতনা কার্য পরিচালনা করতে হবে।

দৃশ্যমান ব্লগপোস্টিতে আমরা খাতনার সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাসআলা আলোচনা করছি। আশা করি সকল পাঠকের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পোস্টটি সাহায্য করবে।

আলোচনায় থাকছে –

ইসলামে খতনা কী?

খতনা মানে হলো – পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া ছেদন করা। অর্থাৎ পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চারদিক থেকে চামড়া কেটে ফেলা।

এর দ্বারা সাধারণত পেনিসের অগ্রচর্মের ভাজ প্রসারিত করা হয় এবং মানব শিশ্নের অগ্রভাগ থেবে চর্মবৃত্ত অপসারণ করা হয়।

এটা পরিবার, সমাজ ও দেশ ভেদে বিভিন্ন ভাবে করা হয়ে থাকে। সাধারণত ছোট খাট অনুষ্ঠান করে এটা করা হয়ে থাকে।

ইসলামে খতনাকে একটি ধর্মীয় কর্ম হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এর দ্বারা পূণ্যলাভ হবে মর্মে রেফারেন্স রয়েছে।

ইসলামে খতনা করা হয় কেন?

ইসলামে খতনা করা একটি মহান সুন্নত। আল্লাহর প্রেরিত বড় বড় নবীগণ এই সুন্নত পালন করেছেন। এই সুন্নত পালন করার জন্য মুসলিমরা খতনা করে থাকে।

বহু হাদিসে খতনা করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যেমন আবু হুরায়রা – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বর্ণনা করেন, মানুষের জন্মগত স্বভাব হলো পাঁচটি –
খতনা করা, নাভির নিম্নদেশের লোম পরিষ্কার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ ও গোঁফ কাটা। (সহিহ বুখারি – ৫৮৮৯)

এছাড়া ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কোনো রোগের কারণে খতনা করা হয়ে থাকে যেমন ফাইমোসিস, প্যারাফাইমোসিস ইত্যাদি।

ফাইমোসিস হলো – পেনিসের অগ্রভাগের চামড়া মূত্রনালীকে ঢেকে রাখে, ফলে প্রস্রাব ঠিকমতো বের হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

এ প্রস্রাব পুরুষাঙ্গের ভেতরে জমে থেকে পুরুষাঙ্গের মাথা ফুলে ওঠে এবং বাচ্ছারা ব্যথায় কান্নাকাটি করে।

আবার অনেক সময় পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া উল্টে শক্ত হয়ে যায়। ফলে সেই চামড়াকে সামনে বা পেছনে নাড়াচাড়া সম্ভব হয় না। এটা হলে পেনিসের মাথার দিকে ফুলে যায় এবং রক্ত চলাচল ঠিক মত হয় না।

উভয় কারণেই খতনা করানোটা জরুরী হয়ে পড়ে।আবার কখনো কখনো ছোট শিশুদের পুরুষাঙ্গ প্যান্টের চেইনের সঙ্গে আটকে যেতে পারে। এ বারণেও খতনা করানো হয়ে থাকে।

খতনা করার বয়স কতো?

একটি ছেলে ছোট থাকা অবস্থায় তার খতানা করে নেওয়ার সর্বোত্তম সময়। এটিই আন- নাববী – রাহিমাহুল্লাহ – বলেছেন।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেন, শিশুদের নামায পড়া শেখানো হবে সাত বছর বয়সে, তাই তার আগেই খতনা করা সুন্নত হবে।

ইমাম ইবনু তাইমিয়া – রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছার আগেই খতনা করে নেওয়া সুন্নত।

আর কোনে ব্যক্তি যদি খতনা না করা অবস্থায় প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যায় তাহলে তার বিষয়ে দুটি অভিমত রয়েছে।

খতনা করার উপকারীতা কী?

  • শরীর অধিক পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা যায়।
  • শিশুদের মূত্রনালীর সংক্রমণ রোধ করা যায়।
  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, জ্বর, স্বাস্থ্যহীনতা ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি কমে।
  • যৌনাঙ্গের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
  • যৌনবাহিত বহু রোগের ঝুঁকি কমে।
  • স্ত্রী মিলনে অধিক আনন্দ ভোগ করা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, পুরুষের খতনা এইচআইভি বা এইডস রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।

খতনাকে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত বলে মনে করেন। খতনার দ্বারা অনেক ধরনের ছত্রাকজাতীয় রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

খতনার প্রধান সুবিধা হলো, এর ফলে লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বকে যে তরল জমে নোংরা অবস্থার সৃষ্টি করে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

খতনার সুফল নিয়ে ড. ব্রায়ান মরিস একটি গবেষণা রিপোর্টে তিনি বলেন, যে সব ছেলেদের খতনা করা হয়নি, তাদের কিডনি, মূত্রথলি ও মূত্রনালির ইনফেকশন চার থেকে দশ গুণ বেশি হয়।

ডা. বিজবেল বলেন, ‘আমি প্রথমদিকে খতনাকে অনর্থক মনে করতাম। কিন্তু দীর্ঘ গবেষণার পর প্রমাণিত হলো – মূত্রথলি ও মূত্রনালিতে সৃষ্ট অনেক জটিল রোগের সমাধান খতনার দ্বারা হয়ে যায়। ’

ডা. রুবসন তাঁর গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করেন, ১৯৩০ থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকায় ৬০ হাজার লোব মূত্রনালির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে কেবল ১০ জন খতনাকৃত আর বাকি সব খতনাবিহীন।

যৌনবিজ্ঞানীরা প্রথম থেকেই এই দাবি করে আসছেন যে, খতনার দ্বারা পুরুষাঙ্গের স্পর্শকাতরতা বেড়ে যায়। এতে যৌন মিলনে নারী ও পুরুষ উভয়ই অধিক আনন্দ উপভোগ করে।

খতনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

খতনার প্রচলন ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিলো তার সঠিক দিন তারিখ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই।

তবে বিভিন্ন রেফারেন্স ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে এটা অনুমান করা যায় যে ঈসা (আ.) এর জন্মের ২,৩০০ বা আরো আগে থেকে এটা প্রচলিত ছিল।

সাইদ ইবনে মুসাইয়াব – রাহিমাহুমুল্লাহ – বলেন, ইবরাহিম – আলাইহিস সালাম – হলেন খতনার সুন্নত পালনকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা – ২৬৪৬৭)

তার এই দাবির পক্ষে রেফারেন্স হলো পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন –

‘স্মরণ করো (সে সময়ের কথা) যখন ইবরাহিমকে তাঁর প্রতিপালক কয়েকটি বাণী দ্বারা পরীক্ষা নেন। অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করেন। তিনি বলেন, আমি তোমাকে মানুষের জন্য ইমাম বানাব।

সে বলল, আমার বংশধরদের থেকেও? তিনি বলেন, জালিমরা আমার ওয়াদাপ্রাপ্ত হয় না। ’ (সুরা বাকারা – ১২৪)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির – রাহিমাহুল্লাহ – বলেন, ইবরাহিম – আলাইহিস সালাম – এর সেই পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি পরীক্ষা ছিলো খতনা করা। (তাফসিরে ইবনে কাসির – ১/৪০৬)

Leave a Comment