ওয়ালিমা কী? কীভাবে ওয়ালিমা করতে হবে?

বিবাহ মুসলিম জীবনে একটি পবিত্রমত কাজ। বিয়ে করে সংসার করা ও সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রতি ইসলাম খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। 

বিয়ে ও তার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট বিধান। তার মধ্যে কিছু আছে ফরজ। কিছু আছে সুন্নাহ। কিছু আছে মুবাহ। আর বহুকিছু হারাম। 

বিবাহের সুন্নাহের মধ্যে একটি হলো ওয়ালিমা। আজকের এই আর্টিকলে আমরা ওয়ালিমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি। আশা করি সকলের জন্য উপকারী হবে।

আলোচনায় থাকবে –

ওয়ালিমার অর্থ কী?

ওয়ালিমা শব্দটি আরবি (ايتلام) থেকে গঠিত। যার অর্থ হলো – একত্রিত হওয়া।

পারিভাষিকভাবে ওয়ালিমা হলো – বাসর রাতের পর স্বামী কর্তৃক যে খাবারের আয়োজন করা হয় সেটাই ওয়ালিমা।

যেহেতু খাবারের এই আয়োজন স্বামী স্ত্রী একত্রিত হওয়ার পর আয়োজন করা হয়ে থাকে তাই এটাকে ওয়ালিমা হয়। 

সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামাদের মতে ওয়ালিমা করা সুন্নাত। কারো মতে, মুস্তাহাব। আবার অনেকে এটাকে ওয়াজিব বলেছেন।

ওয়ালিমা সম্পর্কে আলেমগণ বিভিন্ন অভিমত পেশ করেছেন। কারো মতে, স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের পরের খাবারই ওয়ালিমা।

কেউ বলেন, আকদের  সময়ে খাবার ব্যবস্থা করাকে ওয়ালিমা বলে।

ইসলামে ওয়ালিমা করার বিধান কী?

বিয়ের পর ছেলে পক্ষ তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পাড়াপড়শি, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গরিব-মিসকিনদের তৌফিক অনুযায়ী আপ্যায়নের ব্যবস্থা করাকে ‘ওয়ালিমা’ বলে।

ওয়ালিমা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – তাঁর বিয়েতে ওয়ালিমা করেছেন এবং সাহাবিদের করতে বলেছেন। 

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – জয়নব বিনতে জাহাশ – রাদিয়াল্লাহু আহনা – কে বিয়ে করার পরদিন ওয়ালিমা করেছিলেন। ( সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর-৫১৭০)।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ছাফিয়াহ – রাদিয়াল্লাহু আনহা – কে বিবাহ করার পর তিন দিন যাবৎ ওয়ালিমার দাওয়াত খাইয়েছিলেন।

(মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস নম্বর-৩৮৩৪)।

আনাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বলেন, রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – আবদুর রহমান ইবনে আওফ – রাদিয়াল্লাহু আনহু – এর গায়ে হলুদ রঙের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? 

তিনি বললেন, আমি এক খেজুর আঁটির ওজন স্বর্ণ দিয়ে একজন মহিলাকে বিবাহ করেছি।

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – বললেন,

‘আল্লাহ তোমার বিবাহে বরকাহ দান করুন। একটি ছাগল জবাই বরে হলেও তুমি ওয়ালিমা করো।’ (সহিহ বুখারি – ৫১৫৫; সহিহ মুসলিম -৩২১০)।

আনাস ইবনে মালেক – রাদিয়াল্লাহু আনহু –  বলেন, 

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – জয়নব – রাদিয়াল্লাহু আনহা -কে বিয়ে করার পর এতো বড় ওয়ালিমা করেছিলেন, যার মতো বড় ওয়ালিমা তিনি তাঁর অন্য কোনো স্ত্রীর ক্ষেত্রে করেননি। ( সহিহ বুখারি: ৫১৬৮)

আনাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বর্ণনা করেন – 

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – জয়নব বিনতে জাহাশকে বিবাহ করার পর  ওয়ালিমা করলেন এবং মানুষকে রুটি-গোশত দিয়ে তৃপ্তিসহকারে খাওয়ালেন। (বুখারি: ৪৭৯৪)

আনাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু – বর্ণনা করেন,

রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –  ছাফিয়াহ – রাদিয়াল্লাহু আনহা -কে মুক্ত করে বিবাহ করলেন এবং তাঁর মোহর নির্ধারণ করলেন তাঁর মুক্তিপণ। 

তিনি তাঁর বিবাহের ওয়ালিমা করেছিলেন ‘হায়স’ নামক খাদ্য দিয়ে, যা খেজুর, পনির ও ঘি দ্বারা তৈরি ছিল। ( সহিহ বুখারি: ৫১৬৯; সহিহ মুসলিম: ২৫৬২)

ওয়ালিমা কখন করতে হবে?

বিয়ের পরদিন ওয়ালিমা করা করা বিধেয়। কেননা সাধারণত বিয়ের প্রথম দিন রাতই স্বামী স্ত্রীর মিলন হয়ে যায়। আর ওয়ালিমা মিলনের পরই করা হয়। 

আর বিয়ের পর দিন করতে না পারলে পরবর্তীতে সুবিধা মতো সময়ে করা যায়। তবে  তিন দিনের ভেতর ওয়ালিমা করা উত্তম। 

ওয়ালিম একদিন বা দুই দিন বা তিন দিন যাবত করা যায়। হাদিসে আছে – এক দিন ওয়ালিমা করা সুন্নত, দুই দিন ওয়ালিমা করা মুস্তাহাব। তিন দিন ওয়ালিমা করা জায়েজ। (মুসলিম: ১৪২৭)।

ওয়ালিমা কীভাবে করতে হবে?

যে কোনো ধরণের খাবারের দিয়ে ওয়ালিমা করা যায়। এমনকি খাজুর দিয়েও ওয়ালিমা করা বৈধ আছে এবং এর দ্বারা সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। 

ওয়ালিমায় অতিরিক্ত ব্যয় করা নিষেধ। ওয়ালিমার জন্য খুব উঁচু মানের খানার ব্যবস্থা করা জরুরি নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করে ওয়ালিমা করে নিলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। 

ওয়ালিমায় ধনী গরীব সকলকে দাওয়াত দেওয়া সুন্নাহ। যে ওয়ালিমায় ধনী ও দুনিয়াদার লোকদের দাওয়াত দেওয়া হয়,

ধার্মিক ও গরিব-মিসকিনকে দাওয়াত দেওয়া হয় না, সেই ওয়ালিমাকে হাদিসে নিকৃষ্টতম ওয়ালিমা হাসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (আবু দাউদ: ৩৭৫৪)।

আনাস – রাদিয়াল্লাহু আনহু –  বলেন,

খায়বার থেকে ফিরে আসার সময় রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম –  খায়বার ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থলে তিন দিন অবস্থান করলেন।

সেখানে ছাফিয়্যা রাদিয়াল্লাহু আনহা -কে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি ওয়ালিমার ব্যবস্থা করলেন আমি লোকদেরকে তাঁর ওয়ালিমার দাওয়াত করলাম। 

এই ওয়ালিমায় রুটি বা গোশত কিছুই হলো না। এই ওয়ালিমার জন্য রাসুলুল্লাহ – সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম – চামড়ার দস্তরখান বিছানোর আদেশ করলেন।

অতপর এই দস্তরখানের ওপর খেজুর, পনির ও ঘি ঢেলে দেওয়া হলো। (বুখারি: ৫৩৮৭)

বিবাহের পর ছেলে কর্তৃক ওয়ালিমা করা সুন্নত। আজকাল মেয়ের বাড়িতে যে ভোজের আয়োজন করা হয়, তা বৈধ নয়। বিয়েতে মেয়েপক্ষের কোনোরূপ খরচ করার কথা নয়।

মেয়ে পক্ষ কেবল সৌজন্যমূলক আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। 

অথচ বর্তমান যুগে ওয়ালিমার এই সুন্নত বর্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাঞ্ছনীয় নয়।

বিশেষ করে কনে পক্ষের ওপর আপ্যায়নের যে চাপ সৃষ্টি করা হয়, সেটা সম্পূর্ণ হারাম। 

অধিকন্তু শর্ত আরোপ করে বরের সঙ্গে অধিকসংখ্যক লোক নিয়ে যাওয়া এবং কনের বাড়িতে মেহমান হয়ে কনের পিতার ওপর বোঝা সৃষ্টি করা আজকের সমাজের একটি জঘন্য কুপ্রথা, যা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা আবশ্যক।

কনেপক্ষের অনিচ্ছুকক হয়ে বা চাপের মুখে বাধ্য হয়ে আপ্যায়ন ও মেহমানদারি করা সম্পূর্ণ হারাম। এতে অংশগ্রহণ করাও হারাম ও পাপ কাজ।

কারও ওপর জোর প্রয়োগ করে কোনো খাবার গ্রহণ করা জুলুমের শামিল।

Leave a Comment